প্রজাপতির রং | পর্ব ৩২ | এনাজের রহস্য ও রোশানের আগমন

এনাজ ও রোশানের মধ্যে উত্তেজনাপূর্ণ সংলাপ, সাইমনের মৃত্যু, এবং এনাজের রহস্যময় আচরণের পেছনের কারণগুলি উন্মোচিত হয়।

প্রজাপতির_রং🦋
Bonous_Part
#Writer_NOVA

—আরে রোশান দেওয়ান যে!!!!

রোশানের কথা শুনে সবাই দ্রুত গতিতে দরজার দিকে তাকালো।তাকিয়ে দেখলো সেখানে কেউ নেই। এনাজ ওদের বোকা বানিয়েছে।সেই ফাঁকে এনাজ মোরশেদের হাত থেকে গান কেড়ে নিয়ে পেছন থেকে একহাতে ওর গলা জড়িয়ে ধরে আরেক হাতে মাথায় গান তাক করে ধরলো।

এনাজঃ কেউ কাছে আসার চেষ্টা করলে সোজা ওপরে পাঠিয়ে দিবো।

সবাই ভয় পেয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এবার রোশান সত্যি সত্যি এসে পুরো প্লানটাই চৌপট করে দিলো।বাইরে থেকে দৌড়ে এসে দরজা দিয়ে ঢুকতে ঢুকতে বললো।

রোশানঃ আমার নোভা কোথায়? তোমরা ওর কোন ক্ষতি করো না প্লিজ।

দরজা দিয়ে দ্রুত গতিতে ঢুকতে ঢুকতে রোশান কথাগুলো বললো।সবার নজর এখন রোশানের দিকে।সেই সুযোগে মোরশেদ ওয়াসিম সেম এনাজের মতো করে নিজেকে ছাড়িয়ে গান হাতে নিয়ে নিলো।তারপর এনাজের মাথায় ঠেকালো।সাইমন দৌড়ে গিয়ে রিভেলবার হাতে রোশানের মাথায় ঠেকালো।রোশান আগাগোড়া কিছু না বুঝে বোকার মতো তাকিয়ে রইলো।

এনাজঃ রোশান বাবু,আরেকটু পর এলে কি হতো?(রেগে)

তায়াংঃ দিলেন তো আমাদের সব প্ল্যানে জল ঢেলে।

রোশানঃ আমি কি করলাম? আর তোমরাই বা কে? ওহ্ তোমাকে তো চিনতে পেরেছি। মুরাদ সাহেবের বড় ছেলে তাজরান।কিন্তু তোমার সাথেরটা কে?

এনাজঃ আমি এনাজ।নোভার স্বামী। আর ও আমার বন্ধু প্লাস নোভার খালাতো ভাই তায়াং😊।

এনাজের নাম শুনে রোশানের চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেলো।অবিশ্বাস্য চোখে বললো।

রোশানঃ এনাজ তো মারা গেছে। তুমি মিথ্যে কেন বলছো?তুমি তো তাজ!!!

তায়াংঃ সত্য-মিথ্যের বিচার পরে হবে। আগে এদের সাথে লড়াই করেন।

কথাগুলো বলে তায়াং ভাইয়া ওর সামনে থাকা লোকটার পেটে একটা লাথি মারলো।এনাজ দুই হাত নাড়িয়ে অনেকটা কুংফু স্টাইলে মোরশেদের হাত থেকে গানটা ফেলে দিলো।রোশান কিছু সময় এদিক সেদিক তাকিয়ে বোকার মতো সাইমনের দিকে তাকালো। তারপর এক ঘুষিতে সাইমনকে দূরে পাঠিয়ে দিলো।সাইমনের নাকের তেরটা তো তায়াং আগেই বাজিয়ে ছিলো।নতুন করে রোশান বাজালো।সাইমন ভেবেছিলো রোশান ফাইট করতে পারে না।অথচ সাইমন তো জানে না রোশান ছোটবেলা থেকে এসবে দক্ষ।আমি চেয়ারে বসে বসে ওদের ফাইট দেখছি।এখন পপকর্ণ হলে খারাপ হতো না।বসে থাকতে থাকতে আমার কোমড়ের হাড্ডি বাঁকা হয়ে গেলো।হাত দুটো রশি দিয়ে বেঁধে রাখার কারণে অবশ হয়ে আসছে।কিন্তু আমাকে এখান থেকে ছুটানোর প্রয়োজন কেউ মনে করছে না।কিন্তু এর মধ্যে ঘটলো এক বিপত্তি। সাইমন সুযোগ বুঝে আবারো রিভেলবার তুলে এনাজের দিকে তাক করে বললো।

সাইমনঃ সবাই থেমে যাও।নয়তো একে শেষ করে দিবো।আমি বলছি থেমে যাও।

রোশান থেমে গিয়ে হাত দুটো ওপরের দিকে তুলে ফেললো।কিন্তু তায়াং ভাইয়া এখনো থামছে না।মোরশেদকে মেরেই যাচ্ছে। সেটা দেখে সাইমন আবারো হুংকার দিলো।

সাইমনঃ তায়াং থাম বলছি।নয়তো একে মেরে ফেলবো।

তায়াংঃ মারবি যখন মার।এত বারবার বলার কি আছে?

তায়াং ভাইয়ার এমন হেয়ালি মার্কা কথাবার্তা শুনে আমার ভয় করছে।যদি সত্যি এনাজকে মেরে ফেলে।
তাহলে এবার সত্যি সত্যি বিধবা হয়ে যাবো।আমার ছেলেটা পুরোপুরি বাবার আদর থেকে বঞ্চিত হবে।আল্লাহ জানে নাভান কেমন আছে?আমার ছেলেটা ভালো থাকলেই চলবে।নাভান ভালো থাকলে আমি আজ এখান থেকে বেচে না ফিরলেও আমার কোন দুঃখ নেই।

সাইমন সিরিয়াস ভঙ্গিতে রিভেলবারের ট্রিগার চেপে ধরলো।আমি চোখ বন্ধ করে দরুদ পড়ছি আর আল্লাহ কে ডাকছি।গুলির শব্দ না পেয়ে পিটপিট করে তাকাতে দেখতে পেলাম সাইমন ট্রিগার চেপে গুলি করার চেষ্টা করছে কিন্তু হচ্ছে না। সেটা দেখে এনাজ, তায়াং দুজনেই হাসছে।

তায়াংঃ সো স্যাড সাইমন বাবু।রিভেলবারে একটা বুলেটও নেই। সব বুলেট আমার পকেটে।

সাইমন পুরো আহাম্মক। রিভেলবারে একটা বুলেটও নেই আর সে এটা এতক্ষণেও টের পেলো না। আর তায়াং তখন থেকে এই রিভেলবার নিয়ে ওদের এরকম বোকা বানালো।এনাজ সাইমনের হাত থেকে রিভেলবার ফেলে এলোপাতাড়ি ওকে মারতে লাগলো।রোশানও ওদের লোকদের মারছে।এখন তায়াং ভাইয়া মোরশেদের হাতে মার খাচ্ছে। হঠাৎ সাইমন চিৎকার করে উঠলো।

সাইমনঃ ভাইয়াআআআআআআআ!!!

🦋🦋🦋

ওর চিৎকারে সবাই ওর দিকে তাকালো। আমার চোখ কপালে।সাইমনের গলা বেয়ে ফিনকি দিয়ে রক্ত পরছে। আমি এনাজের দিকে তাকাতেই দেখতে পেলাম ওর হাতে রক্তাক্ত ছোট একটা ধারালো ব্লেড।যেটা ও কিছু সময় আগে চুল থেকে বের করেছে।সাইমন ধপ করে নিচে পরে গেল।মোরশেদ দৌড়ে সাইমনের কাছে ছুটে এলো।সাইমনের মাথাটা নিজের কোলে নিয়ে ব্যস্ত ভঙ্গিতে পাগালোর মতো বলতে লাগলো।

মোরশেদঃ ভাই তোর কি হয়েছে? ভাই, কথা বল তুই। তোর কিছু হতে দিবো না আমি।তোর কিছু হবে না।

মোরশেদ সাহেব সাইমনের নাকের সামনে দুই আঙুল রেখে সাইমন বলে চিৎকার করে উঠলো।এনাজ ওর সামনে এক হাঁটু মুরে বসলো।

এনাজঃ তোর ভাই আর নেই রে।অনেক ভালো ছেলে ছিলো।আমার খুব কষ্ট হচ্ছে ওর জন্য।মন খারাপ করিস না।পৃথিবীতে কেউ চিরদিন বেঁচে থাকে না।কষ্ট পাস না।একটু পর তুইও ওর সাথে চলে যাবি।দুজন একসাথে দেখা করতে পারবি।তোর ভাই আগে গিয়েছে। তুই না হয় একটু পরে যা।

এনাজের এসব গা জ্বালানো কথা শুনে মোরশেদ রেগে কাঁদতে কাঁদতে চেচিয়ে বললো।

মোরশেদঃ তোকে জিন্দা ছাড়বো না আমি।

এনাজঃ আমি ওকে বেশি কিছু করিনি তো।যাস্ট একটা গলা বরাবরি ব্লেডটা দিয়ে পোঁচ দিয়েছি।সাথে সাথে পরপারে।তোর সানগ্লাসে চুল ঠিক করতে করতে যে চুলের মধ্যে ব্লেডটা লুকালাম তাও দেখতে পাসনি? এতো কাঁচা খেলোয়াড় হয়ে খেলতে কেন নেমেছিস?আমরা দুই বন্ধু তো তোদের দুই ভাইকে কিভাবে মারবো তার প্ল্যান করেই এসেছি।

মোরশেদঃ আমি তোকে ছাড়বো না এনাজ।(চিৎকার করে)

এনাজঃ কেন রে খুব কষ্ট হচ্ছে? খুব বেশি কষ্ট হচ্ছে? আমারো হয়েছিল। যখন তুই আমার ছোট ভাইকে মেরে ফেলতে চেয়েছিলি।সেদিন তায়াং না থাকলে তো মেরেই ফেলতি।তাই তো ওকে অস্ট্রেলিয়া পাঠিয়ে দিয়েছি আমি।নিজের ফ্ল্যাটটাও বিক্রি করে দিয়েছি।যাতে ওর কোন খোঁজ না পাস।আমার ভাই আড়াই বছর ধরে আমার চোখের আড়ালে।আমার স্ত্রীর থেকেও দূরে রেখেছিস।মরতে মরতে বেঁচে গেছি আমি।জিন্দা লাশ হয়ে ছিলাম।আমার ভেতরের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গিয়েছিলো।

এনামকে একবার কিছু লোক মেরে গুরতর আহত করে রাস্তায় ফেলে গিয়েছিলো। ভাগ্যক্রমে তায়াং ভাইয়া সেদিন ঐ রাস্তা দিয়ে ফিরছিলো।দূর থেকে কিছু ছেলেকে কাউকে মারতে দেখে দৌড়ে যায়।তায়াং ভাইয়াকে দেখে ওরা পালিয়ে যায়। তায়াং ভাইয়া গিয়ে দেখে সেটা এনাম।দ্রুত ওকে হসপিটালে ভর্তি করে।সেই মাসেই এনাম অস্ট্রেলিয়া চলে যায়।এসব কথা আমি আগে জানতাম না।কয়েক দিন আগে তায়াং ভাইয়া বলেছিলো।

সাইমনের গলার কাছ দিয়ে সরু রক্তের ধারা বইছে।আমার মাথা ঘুরাচ্ছে তা দেখে।নিজের চোখের সামনে এরকম মৃত্যু দেখলাম।তাও আবার আমার স্বামীর হাতে হয়েছে।সাইমন যতই খারাপ হোক।আমি ওর মৃত্যু এভাবে চাইনি।মোরশেদ সাহেব সাইমনকে ছেড়ে এনাজের সাথে ফাইট করা শুরু করলো।আমার এসব দেখতে আর ভালো লাগছে না। তাই আমি অন্য দিকে চেয়ে রইলাম।হঠাৎ একটা গুলির শব্দে সব নিশ্চুপ হয়ে গেলো।আমি ভয় পেয়ে চট করে সেদিকে তাকালাম।মোরশেদ ওয়াসিম মুখ থুবড়ে নিচে পরে গেলো।রোশানের হাতে থাকা গানের থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে। আমি বিস্ফোরিত চোখে ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম।তায়াং ভাইয়া,এনাজও অবাক।মোরশেদের সাঙ্গপাঙ্গরা দৌড়ে পালাতে নিলে সবকটা কে ধরে আচ্ছা পিটুনি দিলো। রোশান গানটা মোরশেদ ওয়াসিমের সামনে ফেলে দৌড়ে আমার কাছে এসে হাতের বাঁধন খুলতে লাগলো।

রোশানঃ তুমি ঠিক আছো তো? তোমার কোথাও লাগেনি তো? আমি পুরো পাগল হয়ে গেছিলাম।

তায়াংঃ কি করলেন আপনি এটা?

রোশানঃ আপনাদের যা করার দরকার ছিলো তা আমি করে দিলাম।

এনাজঃ আপনি মারলেন কেন? ওর সাথে শত্রুতা আমাদের,আপনার নয়।

রোশানঃ ও আমার পাখিকে এখানে আটকে রেখে কষ্ট দিয়েছে। তাই মেরে ফেলছি।আপনারা কোন টেনশন করো না। আমার আইনমন্ত্রীর সাথে ভালো সম্পর্ক আছে। আমি সব সামলে নিবো।

তায়াংঃ তার কোন দরকার নেই। আমিই ইনফর্ম করে দিচ্ছি দুই পক্ষ পাল্টা গোলাগুলিতে মোরশেদ নিহত হয়েছে।

🦋🦋🦋

তায়াং ভাইয়া সামনে থেকে সরে গিয়ে পকেট থেকে মোবাইল বের করলো।তারপর তার আন্ডারে থাকা কর্মীদের কল করে এখানে চলে আসতে বললো।মোরশেদের বাকি সাঙ্গপাঙ্গরা একেকজন আহত হয়ে এদিক সেদিক পরে আছে। রোশান আমার বাঁধন খুলে হাত ধরে দাঁড় করালো।এনাজ এসে এক ঝাটকায় রোশানের হাত থেকে আমার হাত ছাড়িয়ে নিজে ধরে নিলো।

এনাজঃ আমাদের সাহায্য করার জন্য ধন্যবাদ। তবে আমার বউয়ের দিকে নজর না দিলেই খুশি হই।ওকে সামলানোর জন্য আমি আছি।

রোশানঃ নোভা,ও কি তোমার এনাজ?

দুজনের মুখেই রাগ স্পষ্ট। আমি একবার এনাজের দিকে তাকাই আরেকবার রোশানের দিকে।

রোশানঃ কি হলো বলো?

আমি উপর নিচ করে মাথা ঝাঁকালাম। রোশান তীক্ষ্ম চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। এনাজের মুখে বিজয়ের হাসি।

রোশানঃ সত্যি এটা তোমার এনাজ?

আমিঃ হুম।

রোশানঃ তাহলে এতদিন আমায় কেন বলোনি?

আমিঃ আমি নিজেই জানতাম না আপনাকে কি বলবো?(বিরবির করে)

রোশানঃ কি বিরবির করছো? স্পষ্ট করে বলো।(রেগে+ চিৎকার করে)

এনাজঃ আস্তে কথা বলুন।আমাদের সাহায্য করেছেন বলে যে আপনি আমার বাটারফ্লাইয়ের সাথে যা খুশি তা ব্যবহার করবেন তা কিন্তু আমি টলারেট করবো না।

রোশানঃ আপনি চুপ করুন।আমি আপনার সাথে কথা বলছি না।

এনাজঃ এ পাগল হয়ে গেছে। চলো তো বাটারফ্লাই।

এনাজ আমার এক হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে লাগলো।তখুনি আমার আরেক হাতে টান পরলো।আমি পেছন তাকিয়ে দেখি রোশান অন্য দিকে ঘুরে শক্ত করে আমার হাত ধরে আছে। আমি থেমে যাওয়ায় এনাজ চেচিয়ে উঠলো।

এনাজঃ কি হলো থামলে কেন?

আমিঃ আমার হাত।( মুখ কুচোমুচো করে)

এনাজঃ রোশান ওর হাতটা ছাড়ুন।

রোশানঃ আমি ছাড়বো না। দেখি আপনি ওকে আমার কাছ থেকে কি করে নিয়ে যান?

এনাজঃ আমি ওর হাসবেন্ড। আমার পুরো অধিকার আছে ওর ওপর।

রোশানঃ গত আড়াই বছর এই অধিকারবোধটা কোথায় ছিলো আপনার, মিস্টার এনাজ?

এনাজঃ সেই কৈফিয়ত আমি আপনাকে দিবো না। ওর হাত ছেড়ে দিন।

রোশানঃ আমি ছাড়বো না।

দুজন আমার হাত ধরে তর্ক শুরু করে দিয়েছে।আমি অসহায়ের মতো কিছুখন এনাজের দিকে কিছুখন রোশানের দিকে তাকাচ্ছি। বিশ্বাস করেন রাসেল ভাই,আমার এখন “ফুল নেবো নাকি অশ্রু নেবো” মুভির ঐ গানটা অনেক মনে পরছে।”বিধি তুমি বলে দাও আমি কার?” মুহূর্তে কল্পনার জগতে চলে গেলাম।আমি এই গানটা গাইছি।

আমিঃ বিধি তুমি বলে দেও আমি কার? দুটি মানুষ একটি মনের দাবিদার।

রোশানঃ আমি পৃথিবীর এই বুকে আগুন জ্বালিয়ে দিবো, তুমি যদি আমারি না হও।

এনাজঃ তুমি বিশ্বাসঘাতকতা করো না প্রিয়া।আমি ছাড়া তুমি কারো নও।

হঠাৎ একটা গুলির শব্দে আমার কল্পানার জগৎ হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো।আমার তো কোনদিকে হুশ ছিলো না। হুট করে তায়াং ভাইয়ার কথা মনে পরলো।তায়াং ভাইয়া তো এখানেই ছিলো।সে কোথায় গেল?গুলির শব্দে তিনজন চমকে উঠলাম।আমি এদিক সেদিক তাকিয়ে আৎকে উঠলাম।এনাজ, রোশানের থেকে হাত ঝাড়া মেরে ছাড়িয়ে চোখ বন্ধ করে জোরে চিৎকার করে বলে উঠলাম।

আমিঃ তায়াং ভাইয়া!!!!

#চলবে

প্রজাপতির_রং🦋
Part_32
#Writer_NOVA

—- তায়াং ভাইয়া!!!!

আমি চিৎকার করে চোখ খুললাম।এনাজ,রোশান দুজন কানে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এত জোরে চিৎকার করেছি যে আমার নিজেরই গলা ব্যাথা করছে।পিটপিট করে চোখ খুলতেই দেখি তায়াং ভাইয়া খাইয়া ফালামু লুক নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

তায়াংঃ ঐ ছেমরি চুপ কর।গলা তো না,মনে হয় ফাটা বাঁশ। কানের পর্দা তো ফাটায় ফালালি।

আমিঃ ওরে পাঠা রে!! আমি তো মনে করছিলাম তুই মইরা গেছত।কেউ তোরে গুলি করে মাইরা ফালাইছে।

তায়াংঃ নাটকি বেগম।নাটক তো ভালোই পারিস শাঁকচুন্নি। ওরা দুজন তোকে নিয়া যা শুরু করছিলো তা থামাইতে উপরের দিকে গুলি করছি।

আমিঃ আর কইস না ভাই। দুইজনের আমার প্রতি ভালোবাসা একেবারে বাইয়া চাইয়া পরতাছে।আল্লাহ গো আমার কোমড় 😵।বসে থাকতে থাকতে কোমড় ধরে গেছে। একটু আগে উঠতে গিয়ে আবার পেলাম ব্যাথা।এমনি আমি সিজারের মানুষ। আর এরা যা শুরু করছে তা সহ্য করার মতো না।

আমার কথা শুনে এনাজ ও রোশান দুজনেই ব্যস্ত হয়ে গেলো।আমার দিকে দুজন এগিয়ে আসতে নিলেই আমি নিজের শরীরে একটু শক্তি জোগাড় করে ব্যাঙের মতো দুটো লাফ দিয়ে পিছিয়ে গেলাম।

এনাজঃ কি হয়েছে তোমার? কোথায় ব্যাথা পাইছো বাটারফ্লাই?

রোশানঃ পাখি,তুমি ঠিক আছো তো?

আমিঃ থাম ভাই তোরা।এত দরদ দেখাইতে হইবো না। দুইজনে আমার দুই হাত টানাটানি কইরা আমার হাতের হাড্ডির জয়েন ঢিলা কইরা ফালাইছোত।হাত দুইটা মনে হয় আরেকটু হইলে ছুইট্টাই যাইতো।যেমনে টানাটানি শুরু করছিলি।আরেকটু সময় থাকলে আমি ছিড়াই যাইতাম।শোন ভাই,তোদের আমি ভালো একটা সলিউশন দেই।

এনাজঃ কি?

রোশানঃ কিসের সলিউশন?

আমিঃ আপনাদের দুজনেরই তো আমাকে লাগবো তাই না।তাহলে আপনারা দুজন মিলে আমাকে সমান দুই ভাগে ভাগ করেন।তারপর দুই ভাগ দুইজন নিয়ে যান।ব্যাস সমস্যার সমাধান হয়ে গেলো।

এনাজঃ আমি তোমার ভাগ আর কাউকে কখনো দিতে পারবো না বাটারফ্লাই। তুমি পুরোটাই আমার।তুমি আগেও আমার ছিলে,এখনও আছো আর ভবিষ্যতেও থাকবে।আমি বেঁচে থাকতে তোমাকে অন্য কারো হতে কখনও দিবো না।

এনাজ রোশানের দিকে তাকিয়ে আমাকে উদ্দেশ্য করে কথাগুলো বললো।রোশান রাগে লুচির মতো ফুলছে।আমি ভয় পাচ্ছি ওরা দুজন আমার জন্য আবার মারামারি না শুরু করে দেয়।দুজনেই একে অপরের দিকে ক্রুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। রোশান, এনাজকে আগে কখনও দেখেনি।এমন কি ছবিও না।যার কারণে সে বিশ্বাস করে নিয়েছে এটা এনাজ।তবে যদি বাই চান্স এনাজের আগের ছবি কিংবা ওকে যদি দেখতো তাহলে এখন এখানে কুরুক্ষেত্র হয়ে যেতো।রোশান কিছুতেই বিশ্বাস করতো না এটা এনাজ।আমি ধপ করে চেয়ারে বসে পরলাম।তায়াং ভাইয়ার লোক চলে এসেছে। তারা মোরশেদ ও সাইমনের লাশটা নিয়ে গেলো।সাথে ওদের সাঙ্গপাঙ্গদেরও।ততক্ষণ সবাই চুপচাপ ছিলো।তায়াং ভাইয়া খোঁড়াতে খোঁড়াতে আমাদের সামনে এসে দাঁড়ালো।

তায়াংঃ তোদের ড্রামা শেষ হয়েছে? এক নায়িকা নিয়ে দুই নায়কের তামিল মুভি শুরু করে দিছিলি।যদি শেষ হয় তাহলে দয়া করে এখান থেকে চল।

আমি তায়াং ভাইয়াকে খুড়িয়ে হাটতে দেখে চোখ দুটো ছোট ছোট করে ওর পায়ের দিকে তাকালাম।পা রক্তে ভিজে গেছে। বেল্টের জুতা রক্তে মাখামাখি। আমি চিৎকার করে বলে উঠলাম।

আমিঃ তায়াং ভাইয়া তোর পায়ে কি হয়েছে? তুই খুড়িয়ে হাঁটছিস কেন?

তায়াংঃ ঐ ছেমরি এত চিল্লাস কে? আস্তে করে কথা বলতে পারিস না।আমি কি তোর মতো বয়রা নাকি?

আমিঃ এর জন্য বলে কারো ভালো করতে নাই।আমি ভালো বলে জিজ্ঞেস করলাম কি হয়েছে? আর তুই আমাকে ধমকাচ্ছিস।

তায়াংঃ বুঝতে পারতাছি না কি হলো। মারামারি করতে গিয়ে নিশ্চয়ই কোন ভারী কিছুর সাথে লেগে নখ উপরে গেছে। তখন টের পাইনি।একটু আগে ব্যাথা অনুভব করে পায়ের দিকে তাকিয়ে দেখি রক্ত বের হচ্ছে। রক্ত মুছতে গিয়ে দেখি অনেকটা নখ উপরে গেছে। এখন অনেক ব্যাথা করছে।

আমিঃ গন্ডারের চামড়া তো টের পাবি কি করে?

এনাজঃ চল বের হই।

তায়াংঃ হুম চল।রোশান আপনিও আমাদের সাথে যেতে পারেন।

রোশানঃ No Thanks.

এনাজ রোশানকে সাইড কাটিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়ালো। আমি কপাল কুঁচকে তার দিকে তাকালাম।কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমাকে কোলে তুলে নিলো।আমার চোখ কোটর থেকে বের হয়ে যাওয়ার উপক্রম। এনাজ যে এমন কিছু করবে তা আমি ভাবতে পারিনি।আমি হাত-পা ছুঁড়ে নামার জন্য ছটফট করতে লাগলাম।

আমিঃ ঐ মিয়া, নামান কইতাছি।জলদী নামান।আপনার সাথে আমার কোন কথা নাই।জলদী নামান, নয়তো কামড় দিমু।

এনাজঃ যত খুশি দিতে থাকো।তবে আরেকবার নড়লে কোলের থেকে ঠাস করে ফ্লোরে ফেলে দিবো।তায়াং চল।মিস্টার রোশান,আপনি চাইলে এখানে থাকতেও পারেন।আবার চলেও যেতে পারেন।পুরোপুরি আপনার ইচ্ছা। আমি আমার বউ নিয়ে গেলাম।

ফেলে দেওয়ার কথা শুনে আমি ভদ্র মেয়ে হয়ে গেলাম।সত্যি যদি ফেলে দেয় তাহলে আমার কোমড়ের হাড্ডি ভেঙে গুঁড়া গুঁড়া হয়ে যাবে।আমাকে যাতে ফেলে দিলে না পরি তার জন্য দুই হাতে এনাজের গলা জড়িয়ে ধরে রাখলাম।এবার আমাকে ফালাতে চাইলেও আমি পরবো না। রোশান রাগে ফেটে যাচ্ছে। বেচারার জন্য খুব কষ্ট হচ্ছে। আহারে, বেচারা!!! রোশান কোন কথা না বলে গটগট করে আমাদের আগে বের হয়ে গেলো।

তায়াংঃ আহা, কি প্রেম!!! আমি হাঁটতে পারছি না।কোথায় আমাকে ধরে ধরে নিয়ে যাবে।তা না করে সে বউকে কোলে তুলে নিয়েছে। একেই বলে বন্ধুত্ব।

এনাজঃ চুপচাপ হেঁটে আয়।এতটুকু তে কি হয়?

তায়াংঃ চুপ শালা।

এনাজঃ আমি তোর বোন জামাই তায়াং।(আমার দিকে তাকিয়ে) একটু আগে তো কোলে উঠিয়েছি বলে ছটফট করছিলে।আর এখন একদম চুপচাপ। জানোই যখন আমার সাথে পারবে না। তাহলে মন-মতলবিগুলো কেন করো? আমার অবাধ্য না হলে কি তোমার ভালো লাগে না?

আমিঃ তায়াং ভাইয়া এই আনাইজ্জারে ভালো হইয়া যাইতে বল।এত দরদ দেখাইতে হইবো না। আমি একাই নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছি।কাউকে প্রয়োজন নেই।

তায়াং ভাইয়া আমার কথা শুনে এনাজের পাশাপাশি দাঁড়ালো। তারপর ওর পিঠে চাপর মারতে মারতে বললো।

তায়াংঃ ভালো হয়ে যাও এনাজ,ভালো হয়ে যাও।

তায়াং ভাইয়ার কথা শুনে আমি হো হো করে হেসে উঠলাম।এনাজ আমাকে নিয়ে সুস্থ স্বাভাবিকভাবে সামনে তাকিয়ে হাঁটছে। আমার দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচিয়ে বললো।

এনাজঃ আবার মুখ খুলছো তো।তখুনি ফালায় দিবো।

আমিঃ না না।প্লিজ ফেলবেন না।

বাকি রাস্তা আমি চুপচাপ ছিলাম।গাড়িতে উঠিয়ে সামনের সিটে বসিয়ে সিট বেল্ট লাগিয়ে দিলো এনাজ।তারপর গাড়ির থেকে এন্টিসেপটিক ও ওয়ান টাইম ব্যান্ডেজ নিয়ে তায়াং ভাইয়ার পায়ে লাগিয়ে দিলো।তায়াং ভাইয়া পেছনের সিটে বসলো।এনাজ আমার সাথে বসে গাড়ি স্টার্ট দিলো।

🦋🦋🦋

গাড়ি চলছে নিজস্ব গতিতে। জানলার কাচ খুলে বাইরে তাকিয়ে আছি।দুপুরের রোদের তেজটা আজ অন্য দিনের থেকে কম।বাতাসে চোখের সামনে বেবী চুলগুলো এসে বারবার ডিস্টার্ব করছে।হাত দিয়ে সেগুলো বারবার ঠিক করে দিচ্ছি। এনাজ ড্রাইভ করার মাঝে মাঝে আমার দিকে আড়চোখে তাকাচ্ছে। যা আমার নজর এড়াচ্ছে না।হঠাৎ আমার নাভানের কথা মনে পরলো।এত ভেজালের মধ্যে আমি ছেলেটার কথা পুরো ভুলেই গেছি।সেই যে গতরাত এখানে এসেছি। আর আজ দুপুরে ফিরছি।এর মধ্যে নিশ্চয়ই নাভান ওর খালামণিদের পাগল করে ফেলেছে আম্মু কো,আম্মু কো বলে।ঠিকমতো খাবারও তো খাবে না।আমার মোবাইল,ব্যাগের খোঁজ আমি নিজেও জানি না।

আমিঃ তায়াং ভাইয়া আমার ব্যাগটা কোথায় রে?মোবাইলটা লাগবে।

এনাজঃ মোবাইল দিয়ে কি করবে?

আমিঃ আপনাকে কেন বলবো?

এনাজঃ সোজা কথা সোজা করে উত্তর দিতে পারো না। এতো ত্যাড়ামী করো কেন?(দাতে দাঁত চেপে)

আমিঃ আমার কাজই ত্যাড়ামী করা।আমি সোজাভাবে কিছু করতে পারি না। আর আমার কাজের জন্য আমি কাউকে কৈফিয়ত দিতে পছন্দ করি না।আপনার মন মতো যখন আপনি চলেন।তখন কি আমি কিছু জিজ্ঞেস করতে যাই?

এনাজঃ রাগিয়ো না আমায়।

আমিঃ কি করবেন রাগালে?কি করবেন? আড়াই বছর পর এসে দয়া দেখানো হচ্ছে। তার কোন দরকার নেই। আমি কারো দয়া বা অনুগ্রহে বাঁচতে চাই না। আড়াই বছর অনেক মানুষের অনেক কথা শুনে, নানারকম বাজে পরিস্থিতিতে পরে নিজেকে শক্ত করে ফেলেছি।এখন নিজের যেটা ভালো মনে হয় তাই করি।কারো কথা শোনার প্রয়োজন মনে করি না।আপনি যা করেছেন তা কখনো ক্ষমার যোগ্য নয়।আমি আপনাকে ক্ষমা করবো না কখনো।

এনাজঃ এখন এসব কথা কেন উঠছে? আমি কি কিছু বলছি?

আমিঃ নাহ কিছু বলেন নি।তবে আচার-আচরণে তাই বুঝাচ্ছেন।আমার ওপর অধিকার দেখানো শুরু করছেন।আমাকে আপনার মন মতো চালাচ্ছেন। এগুলো আমি একদম সহ্য করবো না।

এনাজঃ তুমি শুধু শুধু ঝামেলা করছো।

আমিঃ আমি তো শুধু শুধুই করি।আর আপনি সব কারণে করেন।আপনি আপনার মতো চলুন।আমি আমার মতো।একদম আমার জীবনে প্রবেশ করার চেষ্টা করবেন না।আমি একাই ভালো আছি।

এনাজঃ আমি একশো বার তোমার ওপর অধিকার দেখাবো।তোমার জীবনে আমিই আছি।আর আমিই থাকবো।

আমিঃ একটুও না।আপনি আড়াই বছর আগের এনাজ নন।আপনি এখন তাজ।এনাজের সাথে আপনার আকাশ-পাতাল তফাৎ।

এনাজঃ সামান্য বিষয় নিয়ে তুমি এমনটা না করলেও পারতে।

আমিঃ একদম কথা বলবে না আমার সাথে। আমি আপনার কেউ হই না।

আমার কেন জানি হুট করে রাগ উঠে গেলো। কেন তাও জানি না। এনাজের পুরনো কথা মনে পরে গেছে। তাছাড়া নাভানের কথাও একবারও জিজ্ঞেস করলো না।আমি নাভানের সাথে কথা বলবো বলে মোবাইল খুঁজছিলাম। সেটাতে কেন যেচে প্রশ্ন করলো।এই বিষয়টাতে যেনো আরো বেশি রাগ হলো তার ওপর।তাই এতো কথা শুনালাম।পেছন থেকে তায়াং ভাইয়া আমাদের দুজনকে ধমকে উঠলো।

তায়াংঃ কি শুরু করলি তোরা? গাড়ির মধ্যে এভাবে কেউ ঝগড়া করে? সবেমাত্র চোখ দুটো লেগে এসেছিলো।তাতেও শান্তি নেই।

আমিঃ তায়াং ভাইয়া, আমার ব্যাগ কোথায় রে?

তায়াংঃ পেছনে। কেন?

আমিঃ আমার মোবাইলটা একটু দে তো।নাভানের খোঁজ নিবো।আল্লাহ জানে ছেলেটা কেমন আছে।

হঠাৎ করে বেশ জোরে এনাজ ব্রেক কষিয়ে গাড়ি থামালো।আমি সামনের দিকে হেলে পরলাম।সিট বেল্ট না থাকলে নির্ঘাত কপাল ফাটতো।আমি চেচিয়ে এনাজকে বললাম।

আমিঃ কি হলো? এভাবে গাড়ি থামালেন কেন? আরেকটু হলেই তো আমার কপাল ফাটতো।

এনাজঃ নাভান কে?

এনাজ নাক,মুখ কুঁচকে বিস্ময়ের ভঙ্গিতে কথাটা জিজ্ঞেস করলো।তার প্রশ্ন শুনে আমার মনে একটা জিদ চেপে গেলো।নাভানের কথা যদি সে নাও জানে তাহলে তাকে আমি বলবো না। বাহ্ কত ভালোবাসা তার।সে জানেই না নাভান কে।আমার তো মনে হয় সে বোধহয় এটাও জানে না যে আমার একটা ছেলে আছে। হয়তো এটাও ভুলতে বসেছে যে সে গায়েব হওয়ার আগে আমি ছয় মাসের প্রেগন্যান্ট ছিলাম।আমি কাঠ কাঠ গলায় উত্তর দিলাম।

আমিঃ আপনার কেউ না।আমার সব।

এনাজঃ মানে? তায়াং তোর বোন কি বলছে?ওর কথা তো আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। নাভান কে?

আমি হাতের আঙ্গুল মুখে নিয়ে ইশারায় তায়াং ভাইয়াকে চুপ থাকতে বললাম।তায়াং ভাইয়া আমার ইঙ্গিত বুঝতে পেরে বললো।

তায়াংঃ সেটা তোর বউয়ের থেকে জেনে নে।তোদের স্বামী-স্ত্রীর ব্যাপার তোরা সলভ কর ভাই।মাঝে আমায় টানিস না।

এনাজঃ নোভা আমি জিজ্ঞেস করছি নাভান কে?

আমিঃ আমি জানি না।

এনাজ আর কোন কথা বললো না।রাগী মুখে ড্রাইভ করতে লাগলো।সারা রাস্তায় কারো সাথে কেউ কথা বললাম না।নাভানকেও কল করলাম না।এনাজের সামনে কথা বলতে চাই না তাই।তায়াং ভাইয়া অর্ধেক রাস্তায় নেমে গেলো। তার আবার অফিসে যেতে হবে কিসব ফর্মালিটি পূরণ করতে।গাড়িতে শুধু আমি ও এনাজ।এনাজের মুখ রাগে লাল হয়ে আছে। তাতে আমার কিছু আসে যায় না।আজ তাকে মনের মতো কতগুলো কথা শুনাতে পেরেছি। তার জন্য মনটা খুশি খুশি লাগছে।আমাদের বাসা থেকে কিছুটা দূরের গলিতে গাড়ি থামাতে বললাম।আমি চাই না সে বাসার সামনে আমাকে নামিয়ে দিক।কেউ দেখলে আবার নষ্টা মেয়ে উপাধি পাবো।তার কি দরকার। আমি গাড়ি থেকে নামতেই এনাজও সাথে সাথে নামলো।

আমিঃ আমাকে সাহায্য করার জন্য ধন্যবাদ। উপকারটা তুলে রাখলাম। যদি কখনো সুযোগ হয় তাহলে এই ঋণ শোধ করে দিবো।

আমার কথা শুনে এনাজ রক্তচোখে আমার দিকে তাকালো।এই চাহনির দিকে তাকিয়ে থাকার সাহস আমার নেই। আমি চোখ নামিয়ে ফেললাম।

এনাজঃ রেডিও স্টেশনের চাকরীটা ছেড়ে দিও।সাথে অফিসের জবটাও ছেড়ে দিবে।

আমিঃ ফাইজলামি পাইছেন।চাকরী ছেড়ে দিলে আমি চলবো কি করো?আমাকে না খেয়ে মরার বুদ্ধি দেন।আমি আপনার কথা শুনছি না। (রেগে)

এনাজঃ এই মাসের মধ্যে আমি নতুন ফ্ল্যাট কিনবো।সেখানেই উঠবো তোমাকে নিয়ে।তোমার খরচের কথা আর চিন্তা করতে হবে না। এখন থেকে সবকিছু আমি বহন করবো। তুমি একা থাকতে থাকতে বেশি উড়তে শুরু করেছো।তোমার উড়ার ব্যবস্থা কমাতে হবে।

আমিঃ আমার যা ইচ্ছা আমি তাই করবো।আমার ইচ্ছায় একদম বা হাত ঢুকাতে আসবেন না।আমি খুব শীঘ্রই আপনার কাছে ডিভোর্স পেপার পাঠিয়ে দিবো। তাতে সই করে আমাকে মুক্তি দিবেন।ডিভোর্স……….

পুরো কথা শেষ হওয়ার আগেই আমার গালে ঠাস করে একটা থাপ্পড় পরলো।গালটা জ্বলে যাচ্ছে, সাথে বা কানটা তব্দা খেয়ে রইলো।গালে হাত দিয়ে এক মিনিট স্তব্ধ হয়ে রইলাম।চোখে সব অন্ধকার দেখছি।সারা মাথা ঝিম ঝিম করছে।সব শক্তি লাগিয়ে আমাকে থাপ্পড়টা মেরেছে এনাজ।আশেপাশের কোন শব্দ শুনছি না।শুধু এনাজের কথাগুলো কোনরকম কর্ণগোচর হচ্ছে।

এনাজঃ অনেকখন ধরে সহ্য করছি।কিছু বলছি না বলে সাহস বেড়ে গেছে? সহ্যের সীমা এবার অতিক্রম করে ফেলেছো।আরেকবার ডিভোর্সের নাম মুখে নিলে কণ্ঠনালি টেনে ছিঁড়ে ফেলবো।তখন আমিও দেখবো ডিভোর্স শব্দটা উচ্চারণ করো কি করে? তুমি চাইলেও আমার সাথে থাকতে হবে,না চাইলেও । ডিভোর্স তোমাকে আমি জীবনেও দিবো না। ভালো কথায় থাকতে না চাইলে শিকল দিয়ে বেঁধে নিজের কাছে রেখে দিবো।তাও অন্য কোথাও যেতে দিবো না। আমার থেকে মুক্তি তোমার জীবনেও মিলবে না।ভালো লাগলেও আমার হয়ে থাকতে হবে, খারাপ লাগলেও আমরই থাকতে হবে। অনেক স্বাধীনতা দিয়েছি।কিন্তু এখন দেখছি এটাই আমার ভুল।এবার বাটারফ্লাইকে তার খাঁচায় বন্দী করার সময় হয়েছে।

আমি গালে হাত দিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছি। পাগলটা কে অনেক রাগিয়ে ফেলছি।আমি তো এমনি ওকে ভয় দেখানোর জন্য ডিভোর্সের কথা বলেছিলাম।কিন্তু পাগলটা যে এতো রেগে যাবে তা কে জানে? আমি তো ওকে কখনো ডিভোর্স দিবো না। আমি চাই না আমার ছেলে বাবা ছাড়া বড় হোক।কিন্তু হীতের বিপরীত হবে তা কে জানতো।

এনাজঃ একবারো কি আমায় জিজ্ঞেস করেছো আমি এই আড়াই বছর কিভাবে পার করেছি? কিভাবে বেঁচে ছিলাম? তোমাকে খুঁজতে খুঁজতে পাগল হয়ে গিয়েছিলাম আমি।সেটা কি জানো তুমি?এমন কোথাও নেই যে তোমাকে খুঁজিনি।আর তুমি ভাবছো তোমাকে আমি একটুও খুজিনি।এই আড়াই বছর আমার ওপর দিয়ে কি ঝড় গিয়েছে তা কি তুমি জানো? এই এনাজটা না তোমার বিরহে পুরো পাগল হয়ে গিয়েছিলো।হাসতে ভুলে গিয়েছিল। মাঝরাতে তোমার নাম নিয়ে চিৎকার করে উঠে পাগলের মতো করতো।তখন আমাকে সামলাতে কি কষ্ট হতো তা আমার পালিত পরিবার কে জিজ্ঞেস করে দেখো।কোথায় তোমায় খুঁজি নি বলো?তোমার বাসায় যে কতবার গিয়েছি তার কোন হিসেব নেই।তোমার বাসার কিংবা গ্রামের কোন লোকজন জানে না তুমি কোথায়?তায়াংদের বাসায়ও গিয়েছিলাম।কিন্তু সেখানে গিয়ে শুনি তায়াংরা বাসা পাল্টে ফেলেছে।প্রতিটা রাত কাঁদতে কাঁদতে মাথাব্যথা উঠে যেতো আমার।রাতটা চোখের পানি নিয়ে পার করতে হয়েছে আমার।এই এনাজ জিন্দা লাশ হয়ে গিয়েছিল। তোমায় পেয়ে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে। একবারও তো জিজ্ঞেস করোনি আমি কেমন আছি,কোথায় ছিলাম এতদিন। হ্যাঁ, আমি মানলাম এই কয়েকদিন তোমার সাথে আমার সেরকম কোন কথা হয়নি।তোমার খোঁজ নেওয়া হয়নি।কিন্তু তুমি তো আমার চোখের সামনে ছিলে।ব্যবসার কাজে তোমার খেয়াল রাখা হয়নি।কিন্তু তুমি কি রেখেছো আমার খেয়াল? সবসময় নিজের দিকটা ভেবো না,বাটারফ্লাই।তোমার বিপরীতে থাকা মানুষটার পরিস্থিতিও বোঝার চেষ্টা করো।তাহলে হয়তো এই অভিমান থাকবে না। অভিমান অনেক খারাপ জিনিস বাটারফ্লাই। এই বস্তুটা তিলে তিলে একটা সুন্দর সম্পর্ক নষ্ট করে দেয়।শুধু এতটুকু মনে রেখো, তুমি যেমন আমাকে ছাড়া ভালো ছিলে না।তেমন আমিও তোমাকে ছাড়া একবিন্দুও ভালো ছিলাম না।একবিন্দুও নয়।

কথাগুলো বলে এক মিনিটও দাঁড়ালো না এনাজ।
চোখ মুছতে মুছতে গাড়ির দরজা খুলে ভেতরে বসে পরলো।তারপর গাড়ি ঘুরিয়ে নিজের গন্তব্যের পথে ছুট লাগালো।আমি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছি মাঝরাস্তায়।সত্যিই তো আমি তো কখনও এনাজের মতো করে বিষয়টা ভাবিনি।এখন নিজের ওপর প্রচন্ড রাগ হচ্ছে। সবসময় এত বেশি কেন বুঝি আমি!!!

#চলবে

এই প্রথম আমার কোন গল্প ৩০ পর্বের ওপরে গেলো।আর কয় পর্ব লাগবে শেষ হতে আমি জানি না।গল্পটা শেষ হওয়ার নামই নিচ্ছে না।এতদিনে আমি ১৫ পর্ব করে দুটো গল্প শেষ করে দিতে পারতাম।কিন্তু এখন একটাই শেষ হয়নি।ফিলিং দুক্কু🥺।আমি একটু অসুস্থ। তাই আগামীকাল গল্প দিতেও পারি,নাও দিতে পারি। তবে না দেওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তাই কেউ অপেক্ষা করে থেকেন না।দিতে পারলে অবশ্যই দিবো।না পারলে কেউ রাগ করেন না।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।