প্রজাপতির রং | পর্ব 34 | এনাজের অশ্রান্ত অনুসন্ধান ও নাভানের আবির্ভাব

এনাজ হুট করে এসে আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কাঁধে মুখ গুঁজে দিলো। ঘরের আলো নিভে গেছে, কিন্তু এনাজের চোখের আকুলতা আমার সামনে স্পষ্ট।

প্রজাপতির_রং🦋
Extra_Part
#Writer_NOVA

এনাজ হুট করে এসে আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কাঁধে মুখ গুঁজে দিলো।ঘটনার আকস্মিকতায় কিছুটা চমকে গেলেও নড়লাম না।মিনিট খানিক পর কাঁধে ঠান্ডা কিছুর পরশ পেতেই বুঝলাম সে কাঁদছে। কিন্তু কেন তা খুঁজে পেলাম না।আমি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।তাকে থামানোর চেষ্টা করলাম না।কাঁদুক সে।তাহলে মন হালকা হবে।আমার চোখ বেয়েও নোনাজল গড়িয়ে পরছে।সেটাও মুছলাম না।আমাকে ছেড়ে কিছু দূর দাঁড়ালো। তারপরে চোখ মুছতে মুছতে বললো।

তাজঃ আজ আমি তোমাকে সব খুলে বলবো।আমার উচিত ছিলো আরো আগেই তোমাকে সবকিছু খুলে বলার।কিন্তু আমি আগে তোমার সাথে কিছুটা স্বাভাবিক হতে চেয়েছিলাম।কিন্তু আমি দেখছি এটাই আমার ভুল হয়েছে।তোমাকে সব খুলে বললে হয়তো পরিস্থিতি এমন হতো না।তুমি কি জানো এই দেড়টা বছর তোমাকে আমি ঠিক কোথায় কোথায় খুঁজেছি? আমি সাত মাস কোমায় ছিলাম।আগুনে আমার চেহারা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। বাম গালের মাংস পুরে হা হয়ে গিয়েছিল। হাতের বাহু থেকে মাংস নিয়ে সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে হয়েছিলো।সব মিলিয়ে আমার স্বাভাবিক জীবনে আসতে পুরো একটা বছর লেগেছিল। যখন স্বাভাবিক জীবনে ফিরলাম তখন আমি হন্যি হয়ে তোমার বাড়ি,আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি চিরে ফেলেছিলাম।কিন্তু তোমাকে পাইনি।কেউ তোমার কোন খোঁজ দিতে পারেনি।এতে আমার মানসিক অবস্থা অনেক খারাপ হয়ে গিয়েছিলো।ঘুমের ঘোরে আমি তোমার নাম নিয়ে চিৎকার করে উঠতাম।আর যখন তোমার কথা মনে হতো তখন আমি পুরো পাগল হয়ে যেতাম।যার কারণে ইংলেন্ডে আমাকে ট্রিটমেন্ট করতে পাঠিয়ে দিয়েছিলো আমার পালিত বাবা।মানুষটা আমার জন্য অনেক করেছে,জানো।তারপর প্রায় পাঁচ মাসের মতো ট্রিটমেন্ট করে আমাকে আবার সুস্থ করেছে। বাকি দিনগুলো আমার ঐখানেই কাটতো।আমি ট্রমার মধ্যে চলে গিয়েছিলাম।কারো সাথে বেশি একটা কথা বলতাম না।তোমার হাসিখুশি এনাজ পুরো চুপচাপ হয়ে গিয়েছিল। ছয় মাস আগে বাবার বিজনেসে বসলাম।কাজের চাপে সারাদিন ভালোই কাটতো।কিন্তু রাতটা আমার কাছে কিরকম বিষাক্ত ছিলো তা আমি বুঝাতে পারবো না তোমায় বাটারফ্লাই ।কত রাত যে নির্ঘুম কাটিয়েছি মাথা ব্যাথায় ছটফট করতে করতে। তা গুণেও শেষ করতে পারবো না। তোমার কথা মনে হলে আমি নিজেকে ঠিক রাখতে পারতাম না।গত ছয় মাসও তোমাকে এদিক সেদিক খুঁজেছি।কিন্তু তুমি আমার চোখের সামনে ছিলে তাও খুঁজে পাইনি।কারণটা হলো যে হারিয়ে যায় তাকে খুজে পাওয়া যায়। কিন্তু যে নিজ থেকে হারিয়ে যায় তাকে তো খুঁজে পাওয়া যায় না।

লোকটার কথা শুনে আমি হা হয়ে গেলাম।এতটা কষ্ট সহ্য করেছে মানুষটা।আর আমি তাকে ভুল বুঝেই গেলাম।একবারও তার দিকটা বিবেচনা করলাম না।এতটা স্বার্থপর কবে হলাম আমি।নিজেকে মনে মনে ধিক্কার জানালাম।

এনাজঃ কিছু দিন আগে আমি ইংল্যান্ড গিয়েছিলাম মনে আছে তোমার?সবাইকে বলেছিলাম আমি ব্যবসায়ের কাজে গিয়েছি।কিন্তু আমি ডাক্তার দেখাতে গিয়েছিলাম।আমার ঘাড়ে যে বারিটা মেরেছিলো ওরা তার জন্য প্রায় আমি অসহ্যকর মাথা ব্যাথা ও ঘাড় ব্যাথায় ভুগতাম তার ট্রিটমেন্ট করতে গিয়েছিলাম।আল্লাহর রহমতে এখন ভালো আছি।

কথাগুলো বলে থামলো এনাজ।তারপর আমার দিকে একটা অদ্ভুত প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো।যা শুনে আমি হতভম্ব।

এনাজঃ আচ্ছা, বাটারফ্লাই। আমার বাচ্চাটাকে ছয় মাসের পেটে থাকতে কি সত্যি মারা গিয়েছিলো? এই প্রশ্নটা না আমার মাথায় ইদানীং অনেক বেশি ঘুরছে।

আমি চোখ দুটো রসগোল্লা করে এনাজের দিকে তাকিয়ে রইলাম।কি বলে এই ছেলে?আমার বাচ্চা পেটে থাকতে মারা গেলে নাভান এলো কোথা থেকে?

আমিঃ কি বলছেন এসব?

এনাজঃ হ্যাঁ আমি ঠিকই বলছি।এক বছর পর যখন আমি একটু সুস্থ হলাম তখন তোমাদের গ্রামে গিয়েছিলাম তোমার খোঁজে, আমার সন্তানের খোঁজে। তখন সেখানকার হাশেম চাচার বউ বললো আমাদের সন্তান নাকি ছয় মাসের পেটে থাকতে মারা গেছে।তুমি নাকি ওয়াসরুমে পিছোল খেয়ে পরে পেটে ব্যাথা পেয়েছিলো।তার জন্য নাকি ওকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। বিশ্বাস করো এই কথাটা যখন আমি শুনেছি আমার পুরো পৃথিবী থমকে গেছে। আমার চারপাশ ঘুরতে শুরু করেছিলো।আমি শুধু পারিনি চিৎকার করে কাঁদতে।নিশ্চয়ই তোমার এর থেকে বেশি কষ্ট হয়েছে তাই না?তুমি তো ওকে ছয় মাস পেটে ধরেছিলে। আমাদের সন্তানের কথা ভেবে কতরাত যে নির্ঘুমে কাটিয়েছি।ও থাকলে এতদিনে দুই বছর হয়ে যেতো ওর তাই না? আমি তোমকে কথাটা জিজ্ঞেস করবো করবো ভেবেও করিনি।যদি তুমি কষ্ট পাও তাই।প্লিজ তুমি পুরনো কথা মনে পরে ভেঙে পরো না।আমারা বরং আবার একটা বেবী নিবো।

শেষের কথাটা অনেক আশা ও উচ্ছাস নিয়ে বললো।যা শুনে আমার অনেক হাসি পাচ্ছে। কিন্তু আমি হাসলাম না।সিরিয়াস মুহুর্তে হাসা উচিত নয়।তবে
শুনো ছেলের কথা!!!আমি পিটপিট চোখে এনাজের দিকে তাকিয়ে রইলাম। তার চোখ, মুখ উপচে পরছে আকুলতা।তাহলে ঘটনা এই।আমার স্বামী মহাশয় জানে তার সন্তান ছয় মাসের পেটে থাকতে মারা গেছে। তাই কখনও আমাকে বাচ্চার কথা জিজ্ঞেস করেনি।যদি আমি কষ্ট পাই।নাহ,এই মানুষটাকে আর কষ্ট দেওয়া যাবে না।অনেক হয়েছে। এবার সব ঠিক করেই নিবো।করুন চোখে আকুল সুরে এনাজ আমাকে বললো।

এনাজঃ কি হলো বলো? আমি কি বাবা ডাকটা শুনতে পারবো না।দিবে না আমাকে একটা বেবী?

আমিঃ বাচ্চার কথা জিজ্ঞেস করার জন্য অন্য কোন মানুষ পাননি?ঐ হাশেম চাচার বউকেই জিজ্ঞেস করতে হলো? ঐ মহিলা তিলকে তাল বানিয়ে সারা গ্রামে ছড়ায়।আর আপনি গিয়ে তাকেই জিজ্ঞেস করেছেন😤?

এনাজঃ উনাকে জিজ্ঞেস করতেই সে এসব বললো।

হাশেম চাচার বউ হলো সারা গ্রামের লোকের বার্তাবাহক বলতে পারেন।তবে সেটা সঠিক নয়।সব আজগুবি আর ভুল খবর এর কাছে পাবেন।মহিলা একে ওপরের সাথে ঝগড়া লাগাতে বেশ পটু।এবাড়ির কথা ও বাড়ি লাগাবে।ও বাড়ির কথা এ বাড়ি।তাই সবাই তাকে এড়িয়েই চলে।এনাজের মারা যাওয়ার ঘটনার পর কিছুদিন আমি বাবার বাসায় ছিলাম।সেখানে একদিন ওয়াসরুমে সামান্য পিছল খেয়ে পরে গিয়ে পেটে ব্যাথা পেয়েছিলাম।সবাই একটু ভয় পেয়ে গিয়েছিল। ভেবেছে বাচ্চার ক্ষতি হয়ে গেছে। তাই জলদী করে ঢাকায় নিয়ে আসা হয় আমার।যতটা ভয় পেয়েছিলাম সবাই ততটা কিছুই হয়নি।ডাক্তার বলে ছিলো বাচ্চা ঠিক আছে।

তখন এই মহিলা সারা গ্রামে ছড়িয়েছিলো আমার বাচ্চা মারা গেছে। নাভান হওয়ার আগে আমি আর বাসায় যায়নি।আর ঐ মহিলা এদিকে বেশি একটা আসতো না বলে সে জানতো আমার বাচ্চা মৃতই ছিলো।এই ঘটনাকে আমি ততটা পাত্তাই দেইনি।কিন্তু এখন দেখছি সেই সামান্য কথা কতবড় আকার ধরা করেছে। আমার স্বামীর কান অব্দি পৌঁছে গেছে। এটা কোন কথা? কি থেকে কি হলো?আমি ভাবনায় হারিয়ে গেছি।এনাজ আমার চোখের সামনে তুড়ি বাজিয়ে বললো।

এনাজঃ এই কোথায় হারিয়ে গেলে?

আমিঃ কোথাও না।আপনার বেবী লাগবে তাই তো?

এনাজঃ হুম।একটা কিউট, গুলুমুলু বেবী।একদম তোমার মতো।

আমিঃ আপনি দাঁড়ান আমি এখুনি নিয়ে আসছি।

এনাজঃ আরে শোনো এখন কোথা থেকে আনবে? এই মেয়ে কি পাগল হলো নাকি?বাটারফ্লাই শোনো………

🦋🦋🦋

এনাজের কথা পুরোটা শোনার আগেই আমি সিঁড়ির দিকে ভো দৌড় দিলাম।সিঁড়ির সামনে এসে আমি হাঁপিয়ে গেলাম।এতটুকু দৌড়ে হাঁপিয়ে গেছি।এখন কি আর আগের বয়স আছে। এক বাচ্চার মা হয়ে গেছি তো।ধীরে সুস্থে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলাম।তারপর আস্তের ওপর দরজার ছিটকিনি খুলে ভেতরে ঢুকলাম। চোরের মতো পা টিপে টিপে রুমে ঢুকলাম।নাভানকে ঘুমন্ত অবস্থায় কোলে তুলে নিলাম।তারপর আবার পা টিপে টিপে বের হয়ে গেলাম।গাড়ির কাছে আসতেই এনাজ আমার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো।

এনাজঃ এই বাচ্চা কার?

আমিঃ অনলাইন থেকে আপনার নামে অর্ডার করেছিলাম।বছর দুই আগে দিয়ে গেছে।

ব্যঙ্গ সুরে কথাটা বলে মিটমিট করে হাসতে লাগলাম।এনাজ বোকার মতো ফেস করে অবাক হয়ে বললো।

এনাজঃ অনলাইনে বাচ্চা অর্ডার করা যায়?

এনাজের কথা শুনে আমার ভীষণ হাসি পাচ্ছে। মুখ টিপে হেসে বললাম।

আমিঃ হ্যাঁ,যায় তো।আপনি জানেন না।

এনাজঃ কোথায় না তো।আমি তো এসব বিষয় কিছু জানি না।তা বাচ্চাটা তো এখনো ঘুমে।ওকে কেন নিয়ে এসেছো? কার না কার বাচ্চা।

আমিঃ অন্য কারো নয়।এটা আপনার বাচ্চা। যাকে আপনি ছয় মাসের পেটে রেখে গায়েব হয়েছিলেন।

আমার কথা শুনে বিস্মিত চোখে এনাজ আমার দিকে তাকালো।

এনাজঃ মমমমাননে???

আমিঃ মানে হলো এতদিন আপনি ভুল জানতেন।আপনার সন্তান ছয় মাসের পেটে থাকতে মারা যায়নি। এই যে আপনার সন্তান। আপনি এতদিন ভুল ইনফরমেশন জেনে এসেছেন। যদি বিশ্বাস না হয় তাহলে তায়াং ভাইয়াকে জিজ্ঞেস করতে পারেন।

এনাজ হা করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। চারিপাশটা বাতির আলোয় আলোকিত থাকায় সেটা দেখতে আমার অসুবিধা হলো না।এনাজ হাত দুটো বাড়িয়ে দিলো।তবে ওর হাত থরথর করে কাঁপছে। চোখে পানি টলমল করছে।কাঁপা কাঁপা গলায় বললো।

এনাজঃ এটা আআআমার ছছেললে!!! তুমি ভুল বলছো না তো।আমার অংশ ও!!!

আমিঃ জ্বি না আমি ভুল বলছি না।এটা আপনার ছেলে নাভান।আর সেদিন জিজ্ঞেস করেছিলেন না নাভান কে? এই আপনার ছেলের নামই নাভান।অবশ্য রিয়েল নাম এনান আহমেদ। আমি চিন্তা করছি ওর নাম জন্ম নিবন্ধন কার্ডে এনান আহমেদ নাভান করে আনবো।

এনাজঃ ওকে একটু আমার কোলে দিবে?

আমিঃ দিতেই তো আনলাম।ওকে ঘুম থেকে উঠিয়ে দেই।

এনাজঃ না না ও ঘুমাচ্ছে ঘুমাক।আমি তো ওকে কোলে নিবো শুধু। ঘুম ভাঙালে কান্না করবে তো।

আমিঃ কেন ওর মুখে বাবা ডাক শুনবেন না?

এনাজ চমকে উঠলো। তবে সেটা খুশিতে।মাথাটা উপর নিচ ঝাঁকিয়ে বুঝালো সে শুনতে চায়।আমি নাভানের ঘুম ভাঙানোর জন্য ওকে ডাকতে লাগলাম।

আমিঃ নাভান, এই নাভান। দেখো কে আসছে? তুমি না জিজ্ঞেস করতে বাবা কবে আসবে? এই যে দেখো তোমার বাবা এসেছে। এখন যদি ঘুম থেকে না উঠো তাহলে বাবা কিন্তু চলে যাবো।

এনাজঃ ও কথা বলতে পারে।

আমিঃ হুম সবকিছু বলতে পারে।

নাভান দু হাতে চোখ কচলে আমার কাঁধ থেকে মাথা উঠালো।তারপর আধো আধো কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো।

নাভানঃ বাবা কো?

আমিঃ সামনে তাকাও। দেখো তোমার বাবা এসেছে তোমার সাথে দেখা করতে।

নাভান পিটপিট চোখে সামনে তাকালো।এনাজ দু হাত বাড়িয়ে রেখেছে। নাভান আমার দিকে তাকালো সম্মতির আশায়।আমি মাথা নাড়িয়ে আস্বস্ত করে নাভানকে বললাম।

আমিঃ যাও বাবার কোলে যাও।এটাই নাভানের বাবাই।

আমার সম্মতি পেয়ে নাভান ওর বাবার কোলে চলে গেল। এনাজ ওকে কোলে নিয়ে দিকপাশ না তাকিয়ে সারা মুখে চুমু খেতে লাগলো।সে এখন খুশিতে পাগলপ্রায়। কি থেকে কি করবে।তা সে নিজেই জানে না।ওর চোখ দিয়ে পানি পরছে। নাহ এটা কোন কষ্টের নয়।বরং পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সুখের।তাকে অনেকদিন পর এত খুশি হতে দেখলাম।চোখ,মুখে আনন্দ উপচে পরছে। যা দেখে নিজের অজান্তেই হাসি ফুটে উঠলো আমার। হঠাৎ এনাজ নাভানের দিকে ভালো করে খেয়াল করে কিছুটা চমকে উঠে আমাকে বললো।

এনাজঃ ওকেই তো আমি পার্কে দেখেছিলাম।ওহ শীট,কি কপাল আমার।আমি নিজের ছেলেকেও চিনতে পারিনি।কখনও কল্পনাও করিনি এই ছেলে আমার রক্তের হতে পারে।

আমি অবাক চোখে তার দিকে তাকাতেই এনাজ আমাকে পার্কের সব ঘটনা বললো।আমি বিস্মিত চোখে তাদের দিকে তাকিয়ে রইলাম।আল্লাহ তাহলে বাপ-বেটাকে বহু আগেই মিলিয়ে দিয়েছিলো।নাভান শক্ত করে তার বাবার গলা জড়িয়ে ধরে আছে। এনাজও নাভানকে শক্ত করে নিজের সাথে মিশিয়ে রেখেছে।

আমিঃ নাভান।

নাভানঃ হুম।

আমিঃ বাবা কে বাবা বলে ডাক দাও।

নাভানঃ আচ্ছা।

আমিঃ বলো।

নাভানঃ বাবা,ও বাবা,বাবা।আমার বাবা।তুমি কই ছিলা বাবা?আমাদের ছেড়ে আর কোথাও যাইয়ো না।

নাভান বাবা বলে ডাক দিয়ে ওর বাবার গালে আলতো করে চুমু খেলো।এনাজ আবারো খুশিমনে ওকে জড়িয়ে ধরলো।

এনাজঃ আমি আর কখনো তোমাদের ছেড়ে কোথাও যাবো না।আবার বলো বাবা।আরেকবার বাবা বলে ডাক দেও আমাকে।

নাভানঃ বাবা।আমার বাবাই।

এনাজ আবারো বাচ্চাদের মতো চোখের পানি ফেলতে লাগলো।এই ছেলেটার বাচ্চামো দেখে আমি নিজেই অবাক।এক ছেলের বাবা হয়ে গেছে আর সে নিজেই বাচ্চামো করছে।কিছু সময় পরপর নাভানের কপালে,গালে,থুতনীতে চুমু খাচ্ছে।ও পুরো দিশেহারা হয়ে গেছে। এবার নাভানকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু খেয়ে কপালে কপাল ঠেকিয়ে রাখলো।নাভান তো ওর বাবার গলায় ছাড়ছে না।কিরকম চুপ করে আছে।হয়তো নাভান ওর বাবার আদর,স্পর্শ, স্নেহগুলো উপভোগ করছে। একেই তো বলে নিজের রক্তের টান।আমি নিরব দর্শকের মতো তাদের বাপ-বেটার কান্ড দেখতে লাগলাম।আজ অন্যরকম ভালো লাগা কাজ করছে আমার।অবশেষে বাবা-ছেলের দেখা হলো তাহলে।আল্লাহর কাছে লাখো কোটি শুকরিয়া। উনি আমার ছেলেকে তার বাবার কাছে ফিরিয়ে দিয়েছে। বাবা-ছেলের মিল দেখে নিজেকে আজ পরিপূর্ণ মনে হচ্ছে।আলগোছে চোখের পানিটা মুছে নিলাম।আর কান্না নয়। আল্লাহ যদি চায় তাহলে এবার বোধহয় আমার সুখের দিন শুরু হবে।

#চলবে

আরিয়ান কেন নাভানের বিষয়টা এনাজকে বলিনি তা সামনের পর্বে বলে দিবো।

প্রজাপতির_রং🦋
Part_34
#Writer_NOVA

—- হ্যালো লিসেনার।কেমন আছেন সবাই?ফিরলাম বিজ্ঞাপনের পরপরি। আমি RJ নোভানাজ কিন্তু চলে এসেছি লাভ কমপ্লেন নিয়ে বহু আগে।আপনারা শুনছেন ঢাকা এফএম 90.04।এখন সময় ৫ টা বেজে ০৭ মিনিট।লাস্ট ঘন্টায় কিন্তু চলে এসেছি আমরা। যাওয়ার সময়ও ঘনিয়ে এসেছে। যারা এখনো আমার সাথে এড হোননি তারাও জলদী করে চলে আসেন।কি অবস্থা সবার? দিনকাল যাচ্ছে কেমন? আমি কিন্তু বিন্দাস আছি।আল্লাহর রহমতে আলহামদুলিল্লাহ চলছে সব।আপনারা জলদী জলদী করে টেক্সট,কমেন্ট করে ফেলুন।এখন আপনাদের পছন্দের সব গান বাজিয়ে দিবো।তাই যত দ্রুত সম্ভব আপনাদের প্রিয় গানের কথা আমাকে জানিয়ে দিন।আপনারা জানাতে থাকেন ততক্ষণে আমি কি করি, কি করি? হুম পেয়েছি। কতগুলো টেক্সট, কমেন্ট পড়তে পারি।পুরান ঢাকা থেকে তিশান জিজ্ঞেস করেছে, আপু কেমন আছো? আলহামদুলিল্লাহ ভালো তিশান।আপনি কেমন আছেন? মানিকগঞ্জ থেকে সুপ্তি জিজ্ঞেস করেছে, আপু আজকে তোমাকে আজ অনেক খুশি খুশি লাগছে ঘটনা কি? এই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেছি বলে প্লিজ কিছু মনে করো না।আমি এমনি জিজ্ঞেস করলাম।অন্য দিনের তুলনায় আজ তোমাকে বেশি খুশি লাগছে তো তাই।আরে সুপ্তি কিছু মনে করার নেই। আমি কিছুই মনে করিনি।আজকে আমি সত্যি অনেক খুশি।আমরা যখন আমাদের সবচেয়ে প্রিয় জিনিস কিংবা মানুষকে হারিয়ে ফেলি।যেটা বা যাকে কখনো আর ফিরে পাবো না।কিন্তু আল্লাহর রহমতে সেটা আবার আমাদের কাছে ফিরে আসে। তখন কতটা খুশি লাগে বল তো? সবকিছু একটা ঘোরের মতো লাগে।খুশিতে পাগল হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়।আমিও আমার হারিয়ে যাওয়া প্রিয় মানুষটাকে পেয়েছি। তাই এত খুশি।আমার তো ইচ্ছে করছে উড়াধুরা ডান্স করতে।হি হি হি 😁।মিরপুর থেকে পারভেজ জিজ্ঞেস করছে, আপু তুমি কি ম্যারিড? ভাই আমার একটা দুই বছরের বেবী আছে। তাহলে এবার বুঝে নিন বিয়ে হয়েছে কিনা।কমেন্ট পরবো এখন। নিশাত জাহান লিখেছে, আপু আমার কমেন্ট পড়ো না কেন? কে বলেছে আপু পড়ি না।এই তো পড়ে ফেললাম।কষ্টের নদী আইডি থেকে একজন কমেন্ট করছে আপু আমার জন্য হৃদয় খানের কোন গান প্লে করে দিও।ভাইয়া কোন গান প্লে করে দিবো একটু বলে দিলে ভালো হতো।আপনি গান ডেডিকেট করে দিন।আমি অবশ্যই বাজিয়ে দিবো।আরিফ হাসান কমেন্ট করে জানিয়েছে তার জন্য আরফিন রুমির মন রাখো পাঁজরে গানটা বাজিয়ে দিতে।খুব সুন্দর একটা গান।আমারও খুব পছন্দ। আচ্ছা আমি বাজিয়ে দিবো।কি ব্যাপারা হুম? দুদিন শো করতে আসিনি বলে আপনারা আমাকে ভুলে গেছেন হুম।এটা কিন্তু ঠিক নয়।কমেন্ট,টেক্সট এত কম কেন? আড়ি দিয়ে দিবো কিন্তু সবার সাথে।নুসরাত টেক্সট করেছে।আপু প্লিজ আমার জন্য ইমরান মাহমুদুলের “তুই তো দেখিস না” গানটা প্লে করে দিবে।প্লিজ আপি, প্লিজ, প্লিজ, প্লিজ।এতবার অনুরোধ। এতবার করে যেহেতু নুসরাত অনুরোধ করলো।আমি কি ফেলে দিতে পারি বলেন।চলুন শুনে আসি ইমরান মাহমুদুলের কন্ঠে তুই তো দেখিস না গানটি।গানের পরে পাঁচ মিনিটের বিজ্ঞাপন বিরতি নিবো।তাই কোথাও যাবেন না।আমার সাথেই থাকুন, ঢাকা এফএমর সাথে থাকুন।

♪♪♪♪♪♪♪♪♪♪♪♪♪♪♪♪♥♥♥♪♪♪♪♪♪♪♪♪♪♪♪♪♪♪

তুই ছাড়া একেকটা দিন, কি যে যন্ত্রণা
বুকের ভেতর অন্তহীন নীল নীল বেদনা(×২)
দুচোখ কি দহনে তুই তো দেখিস না
তুই ছাড়া একেকটা দিন, কি যে যন্ত্রণা
বুকের ভেতর অন্তহীন নীল নীল বেদনা(×২)

চোখের ভেতর বৃষ্টি হয় হৃদয়টা হয়ে যেন নদী
তোর না থাকার একেকটা খন ছুঁয়ে দেখতি যদি(×২)
আমায় ছেড়ে কখনো দূরে যেতি না
তুই ছাড়া একেকটা দিন, কি যে যন্ত্রণা
বুকের ভেতর অন্তহীন নীল নীল বেদনা(×২)

হাজার জনম চাই না তোরে একটা জনম শুধু চাবো
বুকপর ভেতর নিশ্বাস জুড়ে তোকেই শুধু পাবো।(×২)
এক জনমের প্রতিখনে আড়াল হবো না।
তুই ছাড়া একেকটা দিন, কি যে যন্ত্রণা
বুকের ভেতর অন্তহীন নীল নীল বেদনা(×২)

♪♪♪♪♪♪♪♪♪♪♪♪♪♪♪♪♥♥♥♪♪♪♪♪♪♪♪♪♪♪♪♪♪♪

গান প্লে করা শেষে বিজ্ঞাপন বিরতি দিলাম।বেশ কিছু সময় ধরে মোবাইলের ভাইব্রেশনে শব্দ পাচ্ছিলাম।যদিও কানে হেডফোন থাকায় পাওয়ার কথা নয়।কিন্তু মোবাইলটা সামনে থাকায় একবার হাত পরেছিলো তার ওপর।মোবাইল হাতে নিয়ে দেখতে পেলাম আননোন নাম্বার থেকে তিনটা মিসড কল এসেছে। কে কল করতে পারে তা ভাবতে ভাবতেই আরেকবার ঐ নাম্বার থেকেই কল চলে এলো।রিসিভ করে কানে দিতেই জোরে চিৎকারের শব্দ পেলাম।

——– ভাবী-ই-ই-ই-ই-ই-ই-ই-ই-ই-ই-ই!!!!

আমিঃ মুসকান??

মুসকানঃ হ্যাঁ, ভাবী আমি মুসকানই।কোথায় তুমি? তোমার নামে বিচার আছে।

আমিঃ আমি আবার কি করলাম?

মুসকানঃ তুমি কি করো নি তাই বলো? আমাদের একটা গুলুমুলু ভাতিজা আছে তার কথা আমাদেরকে কেন বলোনি? এর জন্য তোমাকে শাস্তি পেতে হবে।

আমিঃ তোমরা জিজ্ঞেস করোনি তাই আমি বলিনি।তোমরা যদি জিজ্ঞেস করতে তাহলে তো আমি বলতামই।

মুসকানঃ আমরা কি করে জানবো? তাজ ভাইয়া বলছে তার বেবী নাকি ছয় মাসে পেটে থাকতে মারা গেছে। তাই আমরাও সেটাই বিশ্বাস করে নিয়েছি।গতকাল রাতে এসে বলছে তোমাদের একটা দুই বছরের বাচ্চা আছে। ভাইয়া খুশিতে পাগল হয়ে যাচ্ছিলো।আমরা শুনে প্রথম ভেবেছি ভাইয়া বোধহয় তোমার শোকে পাগল হয়ে গেছে। পরে ভাইয়া তোমাদের তিনজনের ফ্যামেলী ফটো দেখালো।যেটা গতকাল তুলেছিলো।আম্মু তো পাগল হয়ে গেছে তোমাদের ছেলেকে বাস্তবে দেখতে।এখন তোমার শাস্তি হলো ছেলেকে নিয়ে সোজা আমাদের বাসায় চলে আসবে। কোন অযুহাত শুনবো না।

আমিঃ আজ তো আসা সম্ভব নয় মুসকান।আজ কোথাও যাবো না। শরীরটা ভালো লাগছে না।তাছাড়া সন্ধ্যা হয়ে এসেছে।

মুসকানঃ তাহলে আগামীকাল।

আমিঃ আগামীকাল তোমার ভাইয়ার অফিসে আজ বিদেশি ক্লায়েন্টদের সাথে মিটিং আছে। সব ফাইল আমার কাছে। আমি যদি না যাই তাহলে মিটিং হবে না।এতে কোম্পানির বিশাল লস হয়ে যাবে। অন্য একদিন যাবো।

মুসকানঃ আমার কাছে একটা আইডিয়া আছে।

আমিঃ কি???

মুসকানঃ তুমি এনানকে নিয়ে আগামীকাল অফিসে চলে আসো।আমিও ভাইয়াদের সাথে অফিসে চলে আসবো।তাহলেই তো সমস্যার সমাধান হয়ে যায়।

আমিঃ আমি তো শো করতে এসেছি। আগামীকালও শো করতে হবে।তখন এখান থেকে বাসায় গিয়ে নাভানকে আনতে অনেক দেরী হয়ে যাবে।

মুসকানঃ আগামীকাল মিটিং কয়টায়?

আমিঃ এগারোটার দিকে।

মুসকানঃ আগামীকাল দশটার দিকে বাসায় গিয়ে তুমি এনানকে বাসা থেকে নিয়ে আসবে।ওকে নিয়ে আসবে মানে নিয়ে আসবে।তুমি এগারোটার আগে চলে এসো।বাকি কিছু আমি সামলে নিবো।আর হ্যাঁ,আরেকটা কথা তোমাকে না ভাইয়া শো করতে মানা করেছে। তাহলে তুমি শো করতে আসছো কেন?

আমিঃ না মানে আসলে (ধূর কি বলি এখন? যেমন ভাই, তেমন বোন।কিছু তো একটা বলতে হবে।কি বলবো, কি বলবো? পেয়ে গেছি)বাসায় বোর হচ্ছিলাম তো তাই চলে আসছি।

মুসকানঃ তুমি যদি এনানকে না আনো তাহলে আমি বলে দিবো তুমি শো করতে এসেছো।কথাটা মনে রেখো।

আমিঃ ওরে পাঁজি মেয়ে।

মুসকানঃ হি হি জলদী চলে এসো কালকে।আমি রাখছি।

আমিঃ মুসকান একটা কথা ছিলো।

মুসকানঃ হ্যাঁ, ভাবী বলো।

আমিঃ আরিয়ান তো জানতো আমার ছেলে আছে। তাহলে তোমাদের বলেনি কেন?

মুসকানঃ এই ষাঁড় গরুর কথা আর বলো না ভাবী।আহাম্মক একটা। তোমাদের ছেলেকে দেখে মনে করছে এটা তোমার বান্ধবী হিমি নাকি এমি কি যেনো নাম। ওহ হ্যাঁ হিমি।হিমির ছেলে মনে করছে।গতকাল ভাইয়া ছবি দেখানোর পর আরিয়ান ভাইয়া বলছে, “আমি তো এই বাচ্চাকে আগেই দেখেছি। কিন্তু আমি ভাবছি হিমির ছেলে।যেহেতু ভাবীর বাচ্চা পেটে থাকতে মারা গেছে সেহেতু তার বাচ্চা আসবে কোথা থেকে? আর আমাদের ভাই তো এখানেই ছিলো।নতুন করে বেবী হওয়ার তো প্রশ্নই উঠে না😶।ভাই ছাড়া নতুন বেবী পেটে আসবে কি করে?” ও কথাগুলো এভাবে বলছে জানো?এর বদমাশ মার্কা কথা শুনে আমি হাসতে হাসতে শেষ।

আমিও হাসতে লাগলাম।আরিয়ান সত্যি অনেক ফাজিল ছেলে।ও ভাবছে নাভান হিমির ছেলে তাই সে কাউকে কিছু জানায়নি।আর ও জানতো আমার বাচ্চা পেটে থাকতে মারা গেছে। আর ওর ভাইতো গত আড়াই বছর ধরে ওদের কাছেই আছে। তাহলে আরেকটা বেবী হওয়ারো চান্স নেই। তাই সে ধরেই নিয়েছে নাভান হিমির ছেলে। আমি মুসকানের সাথে কথা শেষ করে কল কেটে দিলাম।বিজ্ঞাপন বিরতি শেষ হয়ে গেছে। আবার শো শেষ করতে হবে। এনাজ যদি জানে আমি শো করতে এসেছি তাহলে আমার খবর আছে। শো-টা বেশি দিন চালাতে পারবো বলে মনে হয় না।

🦋🦋🦋

সন্ধ্যা নেমেছে বহু আগে। পুরো পৃথিবী রাতের কালো আঁধারে ডুবে গেছে। এই আঁধারের সাথে সাথে আরেকজনের জীবনও আঁধারে ডুবে গেছে। সে আর কেউ নয়।রোশান দেওয়ান!!!বিষন্ন মনে একের পর এক সিগারেট ফুঁকছে রোশান।সারা রুম অগোছালো। মদের বোতলগুলো এদিক সেদিক পরে আছে।নেশায় বুদ হয়ে একপাশে পরে আছে রোশান।রোশানের চেহারার অবস্থা অনেক খারাপ।চুলগুলো অগোছালো, এলোমেলো। চোখ,মুখ লাল হয়ে আছে। পুরো বিধ্বস্ত লাগছে ওকে।কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে তমাল তার বসকে পর্যবেকক্ষণ করছে। কয়েকদিনের ব্যবধানে গোছালো ছেলেটা পুরো অগাছালো হয়ে গেছে। ওকে দেখলে এখন কেউ বিশ্বাস করতেই পারবে না এটা যে আগের রোশান।তমাল ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে রোশানের সামনে দাঁড়ালো। ভয়ে ভয়ে মৃদুস্বরে ডাকলো।

তমালঃ বস!!!

রোশানঃ হুম বল।

রোশান মাথা না উঠিয়ে ঠান্ডা কন্ঠে বললো।এতে তমাল কথা বলার সাহস পেয়ে গেল।কোন ভনিতা ছাড়া বলে উঠলো।

তমালঃ এই পর্যন্ত আধা ঘণ্টার মধ্যে দুই প্যাকেট সিগারেট শেষ করে ফেলছেন।সারাদিনে মদ গেলাও হয়েছে কয়েক বোতল।আরো খেলে সমস্যা হবে। আপনার তো অভ্যাস নেই।

রোশান মাথা উঠিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি দিলো।সেই হাসিতে তমাল স্পষ্ট চাপা কষ্টের দেখা পেলো।

রোশানঃ কিছু হবে না তমাল।আমার জন্য চিন্তা করো না।আমি ঠিক হয়ে যাবো।তবে কিছু দিন যাক তারপর। এত তাড়াতাড়ি ওকে ভুলতে পারবো না আমি।আমার একটু সময় লাগে।এবার তো কিছুই না।সেবার যখন আমার পাখির বিয়ে হয়ে গেলো তখন সারারাত সিগারেট টানতাম।নয়তো বারে গিয়ে পরে থাকতাম।তখন আমাকে একটা মেয়ে সামলিয়ে ছিলো।মেয়েটার নাম ছিলো জারা।বাবার বন্ধুর মেয়ে। বাবা ওর সাথে আমার বিয়ে ঠিক করতে চেয়েছিলো।কিন্তু আমি মানা করে দেই।জারা আমায় খুব ভালোবাসতো জানো।কিন্তু আমি ওকে ঠকাতে চাইনি। ওর ভালোবাসাকে দূরে ঠেলে দিয়ে আবারো নোভার পেছনে ছুটেছিলাম।অনেক ভালোবাসি ওকে।ওর জায়গা আমি অন্য কাউকে দিতে চাই না।

তমালঃ ঐ জারা নামের মেয়েটা কোথায়?

রোশানঃ ইউরোপ কান্ট্রিতে আছে।

তমাল অবাক চোখে রোশানের দিকে তাকিয়ে রইলো। রোশান কখনো কাউকে নিজের কোন কথা বলে না।কতটা কষ্টে থাকলে কেউ এভাবে কথা বলে তা তমালের জানা নেই। এই মুহুর্তে তমাল মনে মনে আল্লাহর কাছে একটা দোয়া করছে।আর সেটা হলো সেই জারা মেয়েটা যেনো এখন ফিরে আসে। একমাত্র ঐ মেয়েটাই রোশানকে সামলাতে পারবে।তমাল মুখ খুলে কিছু বলতে চেয়েছিলো। কিন্তু তার আগে বাসার কোলিং বেল বেজে উঠলো। তমাল দ্রুত পায়ে সদর দরজার দিকে চলে গেল ।

তমাল দরজা খুলতেই অবাক হয়ে গেলো।দরজার অপরপাশে দাঁড়িয়ে আছে একটা মেয়ে। দেখতে,শুনতে সবদিক দিয়ে মাশাআল্লাহ। চেহারায় আছে লাবণ্যতা।পরনে নেভি ব্লু কালার হাটু অব্দি টপস,কালো কালার জিন্স, গলায় কালো রঙের ওড়না পেঁচানো। পায়ে নেভি ব্লু রঙের কেডস, হাতে ল্যাগেজ,চুলগুলো লাল রং করা।বয়স ২৪ না হলেও তার কাছাকাছি হবে।মেয়েটাকে আগে কখনো দেখেছে বলে মনে হচ্ছে না তমালের।

তমালঃ কাকে চাই?

— রোশান আছে?

পিচ্চি মেয়ের মুখে রোশানের নাম শুনে কিছুটা রেগে গেল তমাল।এতটুকু মেয়ে নিজের থেকে বড় ছেলেকে নাম ধরে ডাকছে বিষয়টা পছন্দ হলো না তমালের।চোখ মুখে বিরক্তি নিয়ে উত্তর দিলো।

তমালঃ হ্যাঁ,আছে।কিন্তু আপনি কে?

— আমি জারা রহমান।রোশানের বাবার বন্ধুর মেয়ে।

কথাটা শুনে চমকে তাকালো তমাল।নিমিষেই ওর মুখে থাকা বিরক্তি খুশিতে রূপান্তরিত হলো।আল্লাহ তাহলে তার দোয়া এত তাড়াতাড়ি কবুল করে নিয়েছে।এর জন্য বলে মন থেকে কিছু চাইলে আল্লাহ কখনো ফিরিয়ে দেয় না।তেমনি তমালের কথাও ফেলেনি আল্লাহ। মনে মনে আল্লাহর দরবারে কোটি কোটি শুকরিয়া জানালো তমাল।মুখে হাসি রেখেই খুশিতে গদগদ হয়ে বললো।

তমালঃ আরে ম্যাডাম আসুন।বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? ভেতরে আসুন।

জারাঃ রোশান কোথায়?

তমালঃ আপনি কি বিদেশে থাকেন?

জারাঃ হুম।

তমালঃ আজ কি বিদেশ থেকে ফিরলেন?

জারাঃ হ্যাঁ, রোশানের বাবা গত পরশু কল করে আমাকে ওর বিষয় সবকিছু খুলে বললো।গতকালই চলে আসতাম।কিন্তু টিকিট পেতে দেরী হয়ে গেলো।রোশান কোন রুমে?

তমাল হা করে তাকিয়ে রইলো।একটা লোক তার ছেলের কথা বলতেই মেয়েটা সুদূর থেকে ছুটে চলে এলো।তাহলে নিশ্চয়ই মেয়েটা রোশানকে অনেক ভালোবাসে।না চাইতেও তমালের মুখে হাসি ফুটে উঠলো। জারা তমালের চোখের সামনে তুড়ি বাজালো।

জারাঃ ও হ্যালো, কোথায় হারিয়ে গেলেন?রোশান কোন রুমে? আমায় নিয়ে চলেন।

তমালঃ হ্যাঁ, ম্যাম চলেন।

সিঁড়ি বেয়ে দুজনেই ওপরে গেলো গেল।জারাকে রুম দেখিয়ে তমাল চলে গেল। ওদের দুজনকে একটু স্পেস দেওয়া উচিত।জারা দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই মদের বিশ্রী গন্ধ নাকে এসে লাগলো।জারা নাকে হাত দিয়ে সামনে এগিয়ে গেলো।পুরো রুমটা আবছা অন্ধকার করে রাখায় জারা কিছু দেখছেও না।পায়ের সাথে বারি খেয়ে মদের বোতলটা ঝনঝন শব্দ করে উঠলো।তাতে রোশান কথা বললো।

রোশানঃ তমাল,আমাকে একটু একা থাকতে দেও।

জারা কোন উত্তর দিলো না। সে অন্ধকারে হাতড়ে লাইটের সুইচ খুঁজতে লাগলো। একসময় পেয়েও গেল।লাইট অন করতেই সাথে সাথে রোশান চোখ বন্ধ করে চোখের ওপর হাত দিয়ে চেচিয়ে উঠলো।

রোশানঃ তমাল লাইট বন্ধ করো।আমার চোখে লাগছে।

অপর দিক থেকে কোন উত্তর না আসায় রোশান পিটপিট করে চোখ খুললো।সামনে তাকিয়ে কিছুটা চমকে উঠলো। চোখ দুটো ভালো করে ডলে আবার তাকালো।না সে ভুল দেখছে না।তার চোখের সামনে হাত গুঁজে জারা দাঁড়িয়ে আছে।

রোশানঃ আজ এত তাড়াতাড়ি নেশা হয়ে গেলো। আমি চোখের সামনে জারাকে দেখতে পাচ্ছি।

জারাঃ তুমি ভুল নয় ঠিকই দেখতে পাচ্ছো।

জারার শব্দ পেয়ে রোশান অবিশ্বাস্য চোখে ওর দিকে তাকালো। তারপর বসা থেকে উঠে দৌড়ে এসে জারাকে জড়িয়ে ধরলো। এতে জারা একটুও অবাক হলো না। ওর জানা ছিলো রোশান এমনকিছুই করবে।বেশ কিছু সময় পর রোশানের ফোঁপানোর আওয়াজ পেলো জারা।তার মানে রোশান কাঁদছে।

জারাঃ কাঁদো রোশান, বেশি করে কাঁদো। এটাই হবে তোমার শেষ কান্না। আমি তোমাকে আর কাঁদতে দিবো না।এখন থেকে তুমি শুধু হাসবে।অনেক কষ্ট পেয়েছো একতরফা ভালোবেসে।নিজেও পেয়েছো আমাকেও দিয়েছো।কিন্তু আর নয়।এবার তোমাকে নিজের করে সব কষ্ট ভুলেও যাবো,তোমাকেও ভুলিয়ে দিবো।সব ঠিক করে ফেলবো আমি।সব ঠিক করে ফেলবো।
(মনে মনে)

মনে মনে কথাগুলো বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো জারা।তবে তার চোখ দুটো চকচক করছে। নতুন আশায় যে সে দেশে ফিরেছে।এবার সে আশা পূরণ করবেই করবে।আর সেই আশাটা হলো রোশানের বউ হওয়া।রোশান এখনো জারাকে ধরে কান্না করেই যাচ্ছে। জারা চোখ বন্ধ করে আলতো করে ওর দুই হাত রোশানের পিঠে রাখলো।

#চলবে

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।