ত্রিধারে তরঙ্গলীলা | পর্ব – ৪০

বছর পেরোয়নি একটাও৷ তবু যেন বহু বছরের তৃষ্ণা। ঠিক এমন করেই তাকিয়ে আছে সৌধ। যে তাকানোতে বাইরে থেকে প্রকাশ পাচ্ছে তীব্র ক্রোধ, অভিমান। অথচ ভেতরে আকুলতায় ভরা। ব্যাকুলতায় গাঁথা। পুরুষালি দেহের ভিতর থাকা ছোট্ট হৃদযন্ত্রটা ছটফট করছে ভীষণ। ক্রোধান্বিত দৃষ্টি দু’টো নির্মল হতে চাইছে ক্ষণে ক্ষণে। কী ভীষণ যুদ্ধ করে নিজের গাম্ভীর্য ধরে রেখেছে ছেলেটা৷ কী ভয়ানক জেদ খাঁটিয়ে আঁটকে রেখেছে অনুভূতিদের। বাচিঁয়ে রেখেছে তীব্র রাগ, কঠিন জেদ। নিধির শরীরটা ভীষণ দুর্বল। মুখের ফর্সা ত্বক ফ্যাকাশেতে পরিণত হয়েছে। তার দুর্বল দেহের ভিতরে থাকা ছোট্ট হৃদয়খানি হঠাৎ অদ্ভূত অশান্তি চাপল। মলিন দৃষ্টিজোড়া ছলছল করে ওঠল। সে কোথায়, কীভাবে এলো, কেন এলো সব প্রশ্ন উহ্য রেখে সৌধর রাশভারি রক্তিম মুখটায় তাকিয়ে সহসা বলে ওঠল,
‘ এ কী অবস্থা তোর! কতদিন ধরে শেভ করিস না? বদ্ধ উন্মাদ লাগছে, ঠিক পাড়ার বখাটেদের মতো। ‘
সৌধর জীবন এখন ছন্নছাড়া। সারাজীবন ডিসিপ্লিন মেনে চলা ছেলেটা এখন উশৃংখল জীবন কাটাচ্ছে। যা তার চেহেরাতেও ফুটে ওঠেছে৷ নিয়ম মেনে না খাওয়াদাওয়া করে আর না শরীরের যত্ন নেয়। তাই তো মাথার এলোমেলো উষ্কখুষ্ক চুল, না কামানো ঘন দাঁড়ি, মোছ দেখে নিধি বিস্মিত। তার বিস্ময় কে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করল সৌধ। পা দু’টো লম্বা করে এক হাঁটুর ওপর হাত রেখে অন্য হাত ছেড়ে বসা ছিল সে। নিধির ছলছল দৃষ্টি আর মলিন মুখের প্রশ্নে ভ্রু কুঁচকে ফেলল৷ দু-হাত চট করে বুকে বেঁধে পা নাচাতে নাচাতে আকস্মিক চোখ বুজল৷ ভাবল কিছু একটা৷ এরপর চট করে চোখ খুলল। নিধি কিছুটা চমকে গিয়ে ঢোক গিলল। সৌধ খেয়াল করল আগের চেয়ে ঢেড় বেশি নিষ্পাপ আর সুন্দরী লাগছে নিধিকে। এলোমেলো চুল, মলিন মুখ, ভীত দৃষ্টি, শুষ্ক ঠোঁট। সর্বত্র জুড়েই আশ্চর্য রকমের সৌন্দর্যে ভরপুর। এই যে চোখের নিচের পাতলা ত্বক কাজল বিহীল কালচে বর্ণে পরিপূর্ণ। এতেও মারাত্মক সুদর্শনীয় লাগছে। ভাবতে ভাবতেই নিধির বুক বরাবর দৃষ্টি আটকাল। সহসা সৌধর চোখ নিচে নামতেই গলা শুঁকিয়ে গেল নিধির৷ ত্বরিত ওড়না ঠিকঠাক করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। খেয়াল করল সৌধ৷ তাচ্ছিল্য ভরে হাসল কিঞ্চিৎ। দৃষ্টি সরাল না৷ একই ভঙ্গিতে তাকিয়ে পা নাচাতে নাচাতে ভাবল, ‘ওখানে থাকা মনটা সুন্দর তো?’
মুহুর্তেই দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল। চোখ থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করল সম্মুখের নারীর প্রতি মুগ্ধতা, বুকের ভেতর হওয়া অসহনীয় ব্যথাকে মাটিচাপা দেয়ার চেষ্টা করল। মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে চাইল নিধিকে ঘিরে সমস্ত অতীত৷ এত এত চেষ্টা কী সফল হলো? একদমই নয়। তবু পুরুষ তো? শক্তিশালী মনের অধিকারী কিনা… তাই ভাণ করল সব ঝেড়ে, মুছে পরিষ্কার করার৷ শেষ অব্দি অবশ্য পুরোপুরি পারল না। ঠিক যেমন ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়া আয়নাকে সারিয়ে তোলা যায় না৷ সৌধ নিজেও পারল না। দাগ ফুটে ওঠলই।
‘ তুই প্র্যাগনেন্ট? ‘
সহজ, স্বাভাবিক একটি প্রশ্ন করতে অস্বাভাবিক ঠেকল সৌধর৷ যেন পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি মুখ দিয়ে উচ্চারণ করল। আচমকা সৌধর মুখে এমন প্রশ্ন শুনে হকচকিয়ে গেল নিধি। পড়ল তীব্র লজ্জা, অস্বস্তি আর ভয়ে। ঢোক গিলল সতর্ক হয়ে। উত্তর না পেয়ে একপেশে হাসল সৌধ। যাতে প্রকাশ পেল শুধুই তাচ্ছিল্য। নিধি জড়োসড়ো হয়ে গেল কেমন৷ মুখটা ছোটো হয়ে গেল খুব৷ সৌধ নিজে থেকেই ফের বলল,
‘ তোর শরীর দুর্বল। এমন অবস্থায় একা একা বেরিয়েছিস কেন জিজ্ঞেস করব না। তোর মহান স্বামী তোকে একা ছেড়েছে কেন তাও জিজ্ঞেস করব না। শুধু জিজ্ঞেস করব, তোর ক’মাস চলছে? বেবির টেককেয়ার করছিস না কেন? বেবিটা তো উড়ে আসেনি। তোদের ভালোবাসার মিলনেই এসেছে। ‘
শেষ বাক্যটি বলতেই নিঃশ্বাস আঁটকে গেল সৌধর। থেমে গেল ছেলেটা৷ দৃষ্টি নত হলো কিঞ্চিৎ। চোয়ালদ্বয় শক্ত হলো, নাকের দু’পাশে ফুলে ওঠল। বেঁধে রাখা হাত দু’টো ছেড়ে গেল আপনাআপনি। বসে থাকা নিধি বিচলিত হলো এহেন দৃশ্য দেখে। নিজের অসুস্থতার কথা ভুলে গিয়ে ত্বরিত বেড থেকে নেমে দাঁড়াল। হাত বাড়িয়ে সৌধর কাঁধ স্পর্শ করে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল,
‘ সৌধ কী হলো, ঠিক আছিস? পাগলামি করিস না ভাই প্লিজ। ‘
স্বভাবসুলভ অতীতের ন্যায় ফের ভাই শব্দটি বলতেই সৌধর ঘোর কাটল৷ সম্বিৎ ফিরতেই সহসা মাথা তুলে রক্তিম দৃষ্টিতে তাকাল। নিধি আঁতকে পিছু হাঁটতে নিতেই শক্ত হাতের নিধির ডান হাত চেপে ধরল। শরীর দুর্বল থাকায় সৌধর বলিষ্ঠ হাতের কঠিন চাপে ব্যথায় হাত টনটন করে ওঠল নিধির। কাঁপা স্বরে বলল,
‘ ব্যথা পাচ্ছি। ‘
ফুঁসে ওঠা সাপটা যেন মিইয়ে গেল হঠাৎ। শক্ত খোলস পাল্টে নির্মল হয়ে গেল মুহুর্তেই। ধীরেধীরে হাতের বাঁধন আলগা করে দু-হাতে কোমর প্যাঁচিয়ে ধরল নিধির। মাথাটা ঠিক তলপেটের কাছে ছুঁইয়ে শ্বাসরোধ করে কম্পিত গলায় বলল,
‘ ও কেন আমার হলো না? ‘
কী আকুল ব্যথা প্রশ্নটিতে! সহসা ডুকরে ওঠল নিধি। ওর কান্নার শব্দে চমকে ওঠল সৌধ। পাগলপ্রায় হয়ে নিধিকে ছেড়ে তড়াক করে ওঠে দাঁড়াল। বড়ো বড়ো করে শ্বাস নিতে নিতে আশপাশে তাকাল উন্মাদের মতো। এরপর তড়িঘড়ি করে কেবিন ছাড়তে উদ্যত হতেই ছুটে এসে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরল নিধি। পা দুটো অবশ হয়ে গেল সৌধর৷ কান জুড়ে বিস্ফোরণ ঘটাল নিধির হাউমাউ করে কান্নার শব্দ। সৌধ শক্ত মূর্তির ন্যায় ঠাঁই দাঁড়িয়েই রইল। বুকের ভেতর বয়ে গেল কালবৈশাখী ঝড়। মিনিট দেড়েক পর কান্না থেমে গেল নিধির। আচমকা সৌধকে ছেড়ে দিল। দাঁড়িয়ে থাকতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল। শরীর দুলছিল তাই গিয়ে বসল বেডে। সৌধ আর ফিরে তাকাল না। যেভাবে দাঁড়িয়ে ছিল সেভাবেই বলল,
‘ তোর আড়াই মাস চলছে। এটাও গোপন রেখেছিলি। আমি গোপনীয়তা পছন্দ করি না৷ বিয়ে যখন করছিস বাচ্চা হবেই। কিন্তু মনে রাখিস, তুই আমার হসনি বলে তোর প্রতি ঘৃণা জন্মেছে। ও আমার হয়নি বলে সেই ঘৃণাটা অটুট থাকবে। ‘
অশ্রুসিক্ত নয়নে চমকে তাকাল নিধি। সৌধ যেন টের পেল সেই তাকানো। ম্লান হেসে দুহাত পকেটে গুঁজে বুক টানটান করে বলল,
‘ নিধি শোন, ভুলবশতও আর কখনো আমাকে ভাই বলবি না। ‘
ক্রন্দনরত কণ্ঠে নিধি বলল,
‘ আমি তো তোর হইনি, তাহলে এখন কী সমস্যা? ‘
দীর্ঘশ্বাস ফেলল সৌধ৷ হতাশার সুরে বলল,
‘ বউ হোসনি সয়ে গেছে কিন্তু তোর বাচ্চার মামা হওয়ার যন্ত্রণা সহ্য হবে না৷ ‘
বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠল নিধির। সৌধ কিয়ৎক্ষণ থেমে পুনরায় বলল,
‘ সাবধান করে গেলাম মাথায় রাখিস। আর তোর স্বামীকে বলিস, সপ্তাহে একদিন অন্তত বউকে দেয়ার জন্য। লাইফে টাকাই সবকিছু নয়। বউ, বাচ্চার থেকে বড়ো কিছু হতে পারে না। ‘
প্রস্থান করল সৌধ। ওড়নার আঁচল মুখে চেপে ফুঁপাতে লাগল নিধি। কয়েক পল পরেই নামী আর ফারাহর সঙ্গে একজন নার্স ঢুকল কেবিনে। তিনজন সচক্ষে দেখতে পেল ওড়নার আঁচল মুখে চেপে কাঁদছে নিধি। ওদের দেখে আকস্মিক সে কান্না থেমে গেল। নার্স বললেন,
‘ ম্যাম, স্যার এসে আপনাকে নিয়ে যাবে৷ কিছুক্ষণ এখানেই রেস্ট নিতে বলেছে। ‘
নিধি দেখল নার্স মহিলাটি তাদের দুই বাসা পরে থাকে। একমাস আগে কথা হয়েছিল একবার। যেদিন জানতে পারে সে গর্ভবতী। অর্পণ স্যার সেদিন সবার বাসায় মিষ্টি পাঠিয়েছিল তাদের মধ্যে এই নার্স আপাও ছিল। তবে কি এনার মাধ্যমেই সৌধ জানতে পেরেছে সে প্র্যাগনেন্ট? নামী, ফারাহর সঙ্গে কথা হলো কিছুক্ষণ। জানতে পারল, কেনাকাটা করে ফুচকা খেতে গিয়ে রাস্তার পাশে ভীড় দেখে কৌতূহল নিয়ে নামী, ফারাহ এগিয়ে আসে৷ ভীড়ের ভেতর তাকে দেখতে পেয়ে ভয় পেয়ে প্রচণ্ড তাড়াহুড়োয় তাকে নিয়ে হসপিটাল চলে আসে। সুহাস বর্তমানে ঢাকাতে। আওয়াজ গেছে চট্রগ্রাম। আশপাশে পরিচিত হেল্পফুল একমাত্র সৌধই রয়েছে। নিধির বিপদ! তারা বন্ধু হয়ে পাশে থাকবে না? কোনোকিছু না ভেবেই সৌধকে কল করে নামী। ব্যস, সবকিছু ভুলে দিকবিদিকশুন্য হয়েই সৌধ উপস্থিত হয়। কিন্তু তাকে ফোন করা, তার উপস্থিতি যে একদম উচিত হয়নি এটা নামী সে সময় না বুঝলেও এবার বুঝতে পারছে। বিপদে মাথা কাজ করে না। আর এতে করেই ঘটে যায় আরেক বিপদ৷ অর্পণ স্যার এলো ঘন্টাখানিক পর। নামী, ফারাহকে দেখে সৌজন্য আচরণ প্রকাশ করল। তার অমায়িক ব্যবহারে মুগ্ধ হলো নামী। স্যারকে দূর থেকেই দেখেছে সে। ক্লাস পেয়েছিল খুব কমদিন। কাছ থেকে স্যার, স্টুডেন্ট সম্পর্কেই বাইরে আজই প্রথম আলাপ। মানুষটাকে বেশ ভালো লাগল তার। নিধি আপু সৌধ ভাইকে ভালোবাসেনি, বাসতে পারেনি। কিন্তু সে ভীষণ রুচিশীল আবারো টের পেল। কারণ অর্পণ স্যারের মতো মানুষকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বাছাই করা দারুণ রুচিরই বহিঃপ্রকাশ। ভালোবাসায় আবেগ থাকে কিন্তু নিয়তি নয়। নিধি আপু হয়তো ভালোবাসাতেও আবেগকে প্রশ্রয় দেয়নি৷ আর সৌধ ভাই? তাকে কেবলই বন্ধু রূপে চেয়ে এসেছে। আজও চায়। প্রমাণ সরূপ কিছুক্ষণ আগের হাউমাউ করে কান্নাটিকেই ধরে নিল। অনুভব করল ঝোঁকের মাথায় সৌধকে ডাকা অন্যায় হয়ে গেছে। এদের সম্পর্ক এখন কোনদিকে বোঝা উচিত ছিল তার। দীর্ঘশ্বাস ফেলল নামী। অর্পণ স্যার তাদের খুব অনুরোধ করল বাসায় যেতে৷ কিন্তু তারা গেল না৷ বিদায় নিল স্যার আর নিধি আপুর থেকে। বিদায় নিয়ে হসপিটাল গেটের সামনে আসতেই দেখতে পেল সৌধর গাড়ি৷ অর্থাৎ এখনো সৌধ ফিরে যায়নি? দুরুদুরু বুকে এগিয়ে এলো নামী পাশাপাশি হাঁটল ফারাহ৷ গাড়ির কাছাকাছি আসতেই জানালা দিয়ে সৌধ মাথা বের করল। বলল,
‘ তোমাদের জন্য ওয়েট করছিলাম। ‘

কেটে গেল আরো তিনমাস। একদিন মাঝরাতে হঠাৎ সৌধর ফোনে নিধির কল এলো। ঘুমহীন সৌধ। সিগারেটের ধোঁয়ায় বুঁদ। হঠাৎ নিধির কল পেয়ে ভ্রু কুঁচকে ফেলল। কিন্তু রিসিভ করল না। পরের বউ মাঝরাতে তাকে কল করবে কেন? পরের বউয়ের কল ধরতে বয়েই গেছে তার। মনে মনে এসব ভেবে অনবরত বাজতে থাকা ফোনটা ছুঁড়ে ফেলল সৌধ। নিমেষে স্ক্রিন ফেটে বন্ধ হয়ে গেল ফোনটা। এরপর কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছে সে। বেলা বারোটায় ঘুম ভাঙলে জানতে পারল সুহাস, আইয়াজ আর প্রাচী এসেছে!

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।