স্টেডিয়ামের প্রত্যেকটা কোণায় কোণায় লোক লাগিয়ে রেখেছে অর্ক!ড্রেসিং রুমে যাওয়ার রাস্তার পাশের গ্যালারিতে একদম কিনার ঘেঁষে থাকা সিটের টিকিট টা অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে অর্কের জন্য জোগাড় করেছে।এখানে বসে আজকে কিরণ চৌধুরীর প্রত্যেকটা কদমের পই পই করে হিসাব রাখবে বলে।হুডির আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে দর্শক সারিতে বসে আছে অর্ক।গ্যালারিতে উপচে পরা মানুষের ঢলকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছিল না।তাই যথা সময়ের আগেই স্টেজে কিরণ চৌধুরীর নাম এনাউন্স করা হলো।ড্রেসিং রুমে অপেক্ষারত কিরণ তাঁর প্রিয় গিটারের তারে টুংটাং শব্দ করে চেক করে নিচ্ছিলো সব কিছু ঠিকঠাক আছে কিনা।নিজের নাম এনাউন্স করা হয়েছে শুনে হুডির কেপটা মাথায় দিয়ে গিটার হাতে ড্রেসিং রুম থেকে বেড়িয়ে আসে।
কিরণ চৌধুরীর নাম এনাউন্স করার সাথে সাথেই স্টেজসহ পুরো গ্যালারি অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে যায়।গ্যালারির রংবেরঙের আলোকসজ্জা আর ছোট বড় লাইটগুলো অফ করে দেওয়া হয়েছে।হঠাৎ করেই স্টেজ এর ঠিক পিছন সাইডের একটা সাদা লাইট জ্বলে উঠল।সবাই বিস্ফোরিত চোখে স্টেজের দিকে দিকে তাকিয়ে আছে।পরনে জিন্স, হোয়াইট-শো আর ব্ল্যাক হুডির আড়ালে খোলা চুলে স্টেজের ঠিক মাঝখানটায় দাঁড়িয়ে আছে রকস্টার কিরণ চৌধুরী!মুহূর্তেই কিরণের নামে প্রতিধ্বনি ভেসে আসছে পুরো স্টেডিয়াম ভর্তি মানুষের কন্ঠ থেকে।কিরণ দুহাত দু’দিকে প্রসারিত করে চোখ বুজে প্রান ভরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে,প্রতিধ্বনিত হওয়া প্রত্যেকটা কন্ঠ অনুভব করছে খুব গভীর ভাবে।একে একে স্টেজে লাগানো প্রত্যেকটা লাইট জ্বলে উঠল।কিন্তু গ্যালারি এখনও অন্ধকারেই নিমজ্জিত আছে!শুধু স্টেজটা বাহারী রঙের আলোতে ঝলমল করছে।পরমুহূর্তেই পুরো স্টেডিয়াম আলোকিত হয়ে যায় দর্শকের হাতে থাকা ফোনের ফ্ল্যাশলাইট দিয়ে।দেখে মনে হচ্ছে আকাশ থেকে এক ঝাক তাঁরা নেমে এসেছে!অবাক চোখে তাকিয়ে আছে কিরণ।এদেশের মানুষ গুলো ওকে এত ভালোবাসে!ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে মুগ্ধ ঘুরে ঘুরে গ্যালারির সৌন্দর্য নজর বন্দী করছে।
প্রতিক্ষা নিয়ে বসে থাকা অর্কের প্ল্যান ফ্লপ হলো!কখন যে কিরণ ওকে ডিঙ্গিয়ে চলে এসেছে ও বুঝতেই পারে নি!স্টেজেও কিরণের মুখ দেখার জোঁ নেই।উৎসুক জনতা মুখিয়ে আছে রকস্টার কিরণ চৌধুরীর গান শুনবে বলে।জনসমুদ্রের নাইন্টি নাইন পার্সেন্ট শ্রোতাই যুবক-যুবতী।হবে নাই বা কেন?লাখো যুবকের হার্ট বিট করে এই রকস্টার কিরণের নামে!কিরণের বাচনভঙ্গি, স্টাইল, এটিটিউড সবকিছুই অন্যদের থেকে বেশ আলাদা।সোস্যাল মিডিয়ায় তার ফ্যান ফলোয়ারের ছড়াছড়ি।বাঙালি হয়েও ইংরেজি গানটাকে এত নিখুঁতভাবে আয়ত্ত্ব করে যে কারো পক্ষেই বোঝা সম্ভব হয় নি যে সে একজন বাঙালি।ধবধবে সাদা গায়ের রং, বাদামী চুল!তাকে দেখেও স্বদেশী মনে হয় না।কিরণের ফ্যান ফলোয়াররা তাকে ফলো করতো একজন বিদেশী রকস্টার হিসেবেই।তবে কিরণ ওর কোনো এক কনসার্টে বাংলা গান গেয়েছিল।যার ফলে সবাই বুঝতে পেরেছিল ও আদৌ কোনো বিদেশিনী নয়,খাঁটি বাঙালি!
মাস ছ’এক আগে অর্ক ওর বন্ধুদের মুখে শুনেছিল মিউজিক ওয়াল্ডে নাকি এক তরুনীর আবির্ভাব হয়েছে।সে নাকি এক সপ্তাহে এতটাই ফেমাস হয়ে গেছে যে এক সপ্তাহে তার ফ্যান ফলোয়ার কয়েক মিলিয়ন ছাড়িয়েছে!অর্ক তখন বন্ধুদের কথায় পাত্তা না দিয়ে হেসে উড়িয়ে দেয়।একদিন ফেইসবুক স্ক্রল করতে করতে কিরণে বাংলা গানের কনসার্ট এর ছোট্ট একটি স্ক্রিপ্ট অর্কের সামনে আসে।নিউজটা দেখে কপাল কুঁচকে আসে অর্কের।আগে অনেক বার কিরণের ইংরেজি গানের স্ক্রিপ্ট নিউজফিডে পেয়েছে কিন্তু কখনও শোনা বা দেখা হয় নি ওর।বরাবরই ইগনোর করতো।কিন্তু এই ভিডিও ক্লিপের ক্যাপশনে থাকা লেখাটি দেখে কৌতূহল দমিয়ে রাখতে পারে নি অর্ক।প্লে করে পুরো ভিডিও টাই দেখে।সাথে সাথে কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে অর্কের।কে এই কিরণ চৌধুরী?অর্কের মনে প্রশ্ন জাগে।সোস্যাল মিডিয়ায় খোঁজ নিয়ে জানতে পারে যতেষ্ট পিচ্চি একটা মেয়ে।বয়স আর কতো?সবে কুঁড়ি পেরিয়ে একুশে পা দিয়েছে!অর্ক আকাশ সমান অবাক হয়।এই বয়সেই জীবনে এত কিছু এচিভ করা এত মানুষদের ভালোবাসা পাওয়া কি চাট্টিখানি কথা নাকি?অর্কের কৌতূহলের মাত্রা বৃদ্ধি পেতে থাকে।সোস্যাল মিডিয়া যত ঘাটছে ওর আকাঙ্ক্ষা ততই বেড়ে যাচ্ছে।অর্কের কাছে সবচেয়ে বেশি অবাক লাগলো এই বিষয়টি লক্ষ্য করে, কিরণ চৌধুরীর সব স্টেজ শো-ই রাতে করে থাকে!আর যে মেয়ের কয়েক মিলিয়ন ফ্যান ফলোয়ার সেই মেয়ের কোথাও একটাও ছবি নেই!যা আছে সব দূর থেকে তোলা।বেশির ভাগ ছবিই কনসার্ট চলাকালীন তোলা।নিজের প্রোফাইলেও আহামরি তেমন কিছুই নেই।এমনকি ওর গাওয়া গানের একটা ভিডিও ক্লিপও নেই!ব্যাপারটা বেশ রহস্যময় মনে হলো অর্কের।এই মেয়ের চলনবলন অনেকটা ওই নিশাচর পাখির মতো।দিনের আলোয় প্রচ্ছন্ন আর রাতের আকাশে মুক্ত স্বাধীন পাখি হয়ে উড়ে বেড়ায়।মেয়ের পার্সোনালিটিও সবার থেকে আলাদা।যা অর্ককে বেশি আকৃষ্ট করে।যত দিন গড়াতে থাকে কিরণ চৌধুরীর প্রতি ধীরে ধীরে আসক্ত হয়ে পড়ে অর্ক।যাকে কোনোদিন চোখের দেখা অব্দি দেখে নি সেই কিরণ চৌধুরীর গলার স্বর না শুনলে ওর ঘুম আসে না।মাঝে মাঝে অর্ক নিজেও খুব অবাক হয়। আদৌ তার দেখা সাক্ষাৎ পাবে কিনা এটারই কোনো ঠিক ঠিকানা নেই অথচ সারাদিনের ক্লান্তি হতাশা মাঝেও ওর গলার স্বর শুনার জন্য মন আঞ্চান আঞ্চান করে!চোখ বন্ধ করলেই তাকে নিজের খুব কাছে অনুভব করে!মাঝে মাঝে খুব ইনসিকিউর ফিল করে।যদি অন্য কেউ এসে ওকে নিয়ে যায়!তবে ওর এমন ফিলিংস এর কারণ ওর নিজের কাছেও অজানা!এই তো গত সপ্তাহে ছুটে গিয়েছিল কানাডায়!তবে সেখানে গিয়ে জানতে পারে কিরণ চৌধুরী বর্তমানে কানাডাতে নেই।কোথায় আছে কেউ জানে না!পরিবারের কেউই তার সম্পর্কে কোনো নিউজ দিতে রাজি হয় নি।যাকে দেখার জন্য উতলা হয়ে এতটা পথ ছুটে গিয়েছিল সেই তো নেই!শেষে নিরুপায় হয়ে অর্ককে চলে আসতে হলো।কাউকে কিছু না বলে উধাও হয়ে যাওয়ায় আয়েশা বেগম খুব রেগে গিয়েছিলেন।দুইটা দিন অর্কের সাথে কথা বলেন নি।
মাইক্রোফোনটা ঠিকঠাক জায়গায় রেখে গিটারের কটগুলোয় আঙ্গুল রেখে পিক দিয়ে আপ-ডাউন করতেই উল্লাসে হৈচৈ শুরু করে দেয় গ্যালারি ভর্তি অপেক্ষাকৃত অজস্র শ্রোতাবৃন্দ!ভাবনা থেকে বেড়িয়ে আসে অর্ক।আমজনতার উচ্ছাসে চারদিকে চোখ বুলিয়ে অর্কের দৃষ্টি আবার সেই কিরণেই স্থির!জনশ্রোতার আকুলতার সমাপ্তি ঘটাতে আর এক মুহূর্ত দেরি না করে গিটারে সুর তুলে গান ধরে কিরণ,
কিছু কথার পিঠে কথা
তুমি ছুঁয়ে দিলে মুখরতা
হাসি বিনিময়ে চোখে চোখে
মনে মনে রয় ব্যাকুলতা
আমায় ডেকো একা বিকেলে
কখনো কোনো ব্যাথা পেলে
আমায় রেখো প্রিয় প্রহরে
যখনই মন কেমন করে
কোনো এক রূপকথার জগতে
তুমি তো এসেছো আমারই হতে
কোনো এক রূপকথার জগতে
তুমি চিরসাথী আমার জীবনে
এই পথে….
কোথাও ফুটেছে ফুল
কোথাও ঝেড়েছে তারা
কোথাও কিছু নেই
তোমার আমার গল্প ছাড়া
তুমি আমার স্বপ্ন সারতি
জীবনে তুমি সেরা সত্যি
কোনো এক রূপকথার জগতে
তুমি তো এসেছো আমারই হতে
কোনো এক রূপকথার জগতে
তুমি চিরসাথী আমার জীবনে
এই পথে….,,,
একের পর এক গানের আবদার পূরণে ব্যস্ত কিরণ!সবার আবদার মিটানো শেষ এবার তার ফেরার পালা!
মুগ্ধতায় পরিপূর্ণ পুরো স্টেডিয়াম।ওয়ান্স মোর ওয়ান্স মোর প্রতিধ্বনিতে উচ্ছ্বসিত পুরো গ্যালারি!অর্কের ঘোর কাটে উৎসুক জনতার কল্লোলে!অবাক চোখে তাকিয়ে ছিল স্টেজে থাকা মানবীর উপর।যতক্ষণে অর্কের হুশ ফিরে ততক্ষণে কিরণ স্টেজ থেকে নেমে ড্রেসিং রুমে চলে গেছে!অর্ক কিরণকে দেখতে না পেয়ে ছুট লাগায় ড্রেসিং রুমের উদ্দেশ্য!বাইরের কেউ ড্রেসিং রুমের ধারেকাছেও এলাউ নয়।তবে সেখানে গিয়ে অর্ক জানতে পারে কিরণ বেরিয়ে গেছে!অর্কের মাথা কাজ করছে না!একদিকে কিরণকে দেখার কৌতুহল অন্যদিকে এই গ্যালারি ভর্তি মানুষকে ডিঙ্গিয়ে এখান থেকে বের হওয়াও মুশকিল!উপায় না পেয়ে শর্টকাট রাস্তার হুদিশ জানতে ঘুষ খাইয়্যে বের হয়েছে।এখন স্টেডিয়ামের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে অর্ক!অর্ক তে রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে ভাবছে কিরণ কোন দিক দিয়ে যেতে পারে?দুইটা রাস্তা পর্যবেক্ষণ করেও এসেছে।কিন্তু ওই দিকে কারো অস্তিত্বও মিলে নি।চুল উল্টে যখন দিশেহারার মতো পাইচারি করছিল তখন ওর সামনে ক্ষানিকটা দূরে ক্ষুদ্র আলোক রশ্মি দেখতে পায় সাথে কারো আবছা ছায়া!আলোর উৎপত্তিস্থল খুঁজে বের করতে সামনে এগোয় অর্ক!আলোর দিক অনুসরণ করে দেখতে পায় এটা বাইকের আলো!আর ছায়াটা হলো বাইকের মালিকের!অর্কের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে।অবশেষে পেয়েই গেলো কাঙ্ক্ষিত মানুষটিকে!হুডি পড়া কাঁধে গিটারসমেত ব্যাগটা ঝুলানো!অর্ক নিশ্চিত ওটা কিরণই!কয়েক মিটার দূরত্বে দুজনের অবস্থান।তাই কিরণকে চিনতে অর্কের ভুল হয় নি!অর্ক পা টিপে টিপে সামনে দিকে এগোতে থাকে!
কিরণ কি আর কম চালাক!পায়ের আওয়াজ না পেলেও ছায়া দেখে ঠিকই বুঝতে পেরে গেছে ওকে কেউ ফলো করছে!কিরণ তাড়াতাড়ি করে বাইকে উঠে বসে।অর্ক আর এক মুহূর্ত দেরি না করে দৌঁড়ে গিয়ে কিরণের গিটারের ব্যাগটায় ধরে ফেলে!
প্রানপ্রিয় গিটারে টান পড়ায় কিরণ খুব রেগে যায়।রাগান্বিত হয়ে অর্কের দিকে ফিরে তাকাতেই চমকে উঠলো অর্ক।হাত আলগা হয়ে আসে গিটারের ব্যাগ থেকে।সামনে থাকা মানবীর দিকে আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে আছে!হুডির আড়ালে এক জোড়া নীলাভাব চোখই শুধু দেখতে পাচ্ছে!চোখ থেকে যেন আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত হচ্ছে!বাইক থেকে নেমে দাঁড়ায় কিরণ!অর্ক কিরণের মুখের মাস্কটায় যেই হাত দিতে যাবে ওমনি কিরণ অর্কের হাতটা খপ করে ধরে ফেলে!হাতসহ অর্ককে ঘুরিয়ে নিয়ে কেরাটি মার দিয়ে অর্ককে কুপোকাত করে দেয়!অর্ক ভাবতেই পারে নি কিরণ এমন কিছু করতে পারে!আর ঘটনাটা এতটাই দ্রুত ঘটেছে যে অর্ক কিছু করার সুযোগই পেলো না!হাতে পায়ে প্রচন্ডরকম আঘাত করে অর্ককে মাটিতে ফেলে দিয়ে কিরণ আর এক মুহূর্তও দেরি না করে বাইক নিয়ে চলে যায়!
কিরণের চলে যাওয়া পথের দিকে কিচ্ছুক্ষণ হতাশ মুখে তাকিয়ে থেকে অর্ক ভগ্নহৃদয় নিয়ে বলে উঠে,
– মেয়ের এলেম আছে বলতে হবে।গানটার সাথে সাথে কেরাটিটাও বেশ ভালোই রপ্ত করেছে দেখছি!আবার বাইক চালাতেও জানে?যে সে বাইকার এই মেয়ের সাথে পেরে উঠবে বলে মনে হয় না।প্রফেশনাল বাইকারদেরও টক্কর দিতে পারবে এই মেয়ে!আর কি কি গুন আছে এই মেয়ের আল্লাহই জানেন।
মাঝরাস্তায় কনুই ভাঁজ করে হাতের তালুতে মাথা রেখে আধশোয়া হয়ে কথাগুলো বলছিল অর্ক।পরক্ষনেই শরীরের বিভিন্ন স্থানে প্রচন্ড রকমের ব্যাথা অনুভব করে!রাস্তা থেকে যেই উঠতে যাবে ওমনি ধড়াম করে আবার পড়ে যায়।পায়ে দাঁড়ানোর মতো শক্তি পাচ্ছে না।হাতগুলো মনে হয় মুচড়িয়ে ভেঙ্গেই দিয়েছে!কথাটা ভেবেই অর্ক নিজেই নিজেকে গালি দিচ্ছে।তাচ্ছিল্য সুরে বলে উঠলো,
– সিরিয়াসলি অর্ক!যেই মেয়ে এই মাঝরাতে তোকে আধমরা অবস্থায় এই রকম একটা নির্জন জায়গায় ফেলে রেখে চলে গেছে আর তুই কি না সেই মেয়েরই গুনকীর্তন করছিস?সো ফানি ইয়ার!
– কিন্তু কথাটা তো সত্য!এই মেয়ে যে এলেমদার সেটা তো স্বীকার করতেই হবে!
হতাশার সুরে কথাটা বলল অর্ক।পরমুহূর্তেই মলিন মুখে বলে উঠলো,
– ওই মেয়ে যে ভাবে আমার হাড়গোড় সব ভেঙ্গে দিয়ে গেছে মনে হয় না এখান থেকে উঠতে পারবো!তাহলে এখন?আমি এখান থেকে বাসায় ফিরবো কি করে?
অর্কের ফোনে কল আসার শব্দে ধ্যান ভাঙ্গে।পকেট হাতড়িয়ে ফোন না পেয়ে সামনে তাকিয়ে দেখে ফোনটা রাস্তায় পরে আছে।বুকে ভর দিয়ে অনেক কষ্টে ফোনটা হাতের কাছে পায় অর্ক।ফোনটার করুণ দশা দেখে কষ্টে ওর বুঁকটা আরো ফেটে যাচ্ছে।ফোনের গ্লাসটা ভেঙ্গে চুর্ণবিচুর্ণ হয়ে গেছে।কোনো কিছু দেখা যাচ্ছে না।ফোনটা অনবরত বেজেই চলেছে।কল রিসিভ করা যাচ্ছে না।অনেক চেষ্টা করার পর কলটা রিসিভ করে অর্ক।ভাঙা ভাঙা গলায় বললো,
– হ্যালো!
……..
– দিহাদ!
…….
– আমি এই যে স্টেডিয়ামের পিছনের দিকটায় একটা গলি আছে না,এইখানে!
…….
– অনেক কিছু হয়ে গেছে রে ভাই! এত কথা ফোনে বলা যাবে না,তুই তাড়াতাড়ি আয়।আর হ্যাঁ শোন!তুই একাই আসিস!
…….
– আমি শুধু তোকে আসতে বলেছি!
…….
– পারলে একটা রিকশা নিয়ে আসিস!
…….
– তোকে এত কথা বলতে কে বলেছে?যা বলছি তুই শুধু
তাই কর।
…….
– ওকে!
___________________
– আহ্ ডক্টর আস্তে!ব্যাথা পাচ্ছি তো!
ডক্টর অর্কের দিকে সন্দিহান চোখে তাকিয়ে বললো,
– সত্যি করে বলো তো কি হয়েছে?
– বাইকে এক্সিডেন্ট করেছি!তখনই তো আপনাকে বললাম!
অর্কের ঝটপট উত্তরে ডক্টর তাজ্জব বনে গেলো।ডক্টর গম্ভীর কন্ঠে বললো,
– বাইক এক্সিডেন্টে শরীরের চামড়া ছুলে যেতে দেখেছি,ক্ষতবিক্ষত হতে দেখেছি, মানুষকে মারা যেতেও দেখেছি!হাড়গোড় ভাঙে ঠিক আছে কিন্তু বাবা বিশ্বাস করো তোমার মতো এই রকম বাইক এক্সিডেন্টের রোগী আমি আমার ডাক্তারি জীবনে দেখি নি!
অর্ক কি বলবে বুঝতে পারছে না।ধরা খেয়ে বসে আছে। কথায় আছে না ডাক্তার আর উকিলের কাছে কখনো মিথ্যা বলতে নেই!নয়তো হিতে বিপরীত হতে পারে,আমতা আমতা করে বললো,
– আ্ আসলে ডক্টর হয়েছে কি……..।
অর্ককে থামিয়ে দিয়ে ডক্টর মুখ টিপে হেসে বললো,
– থাক বলতে হবে না।আমি বুঝতে পারছি তোমার সাথে কি হয়েছে।কিন্তু আমার অবাক লাগছে,এত সুন্দর সুঠাম দেহের অধিকারী হয়েও পরাস্ত হলে?
– আমি কি আর জানতাম বজ্জাত মেয়ে এত পাজি!
বিড়বিড় করে দাঁতে দাঁত চেপে কথাটা বলে অর্ক।ডাক্তার সন্দিহান চোখে তাকিয়ে বললো,
– কিছু বললে?
অর্ক মেকি হেসে বললো,
– কই কিছু বলি নি তো!
– আমি তো শুনলাম তুমি বিড়বিড় করছো।
অর্ক গলা খাঁকারি দিয়ে টেনে টেনে বললো,
– আসলে ডক্টর আমি জানতাম না ও আমার উপর এট্যাক করবে!জানলে কি আর এমনি এমনি ছেড়ে দিতাম!
– যাকগে বাদ দাও।এই যে এই ঔষধ গুলো ঠিক মতো খাবে।সকালে আর বিকেলে আস্তে আস্তে হাটবে।আশা করি সপ্তাহ খানিকের ভিতরেই ঠিক হয়ে যাবে।
– ওকে!থ্যাংক ইউ ডক্টর!
– এটা আমার ডিউটি ইয়াংম্যান!থ্যাংকস দিতে হবে না।

চলবে…

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।