আমি ভর্তি হবার সুযোগ পেলাম তিতুমীর কলেজে। সাবজেক্ট প্রানীবিদ্যা। ইউনিভার্সিটির ভর্তি যুদ্ধে ছিটকে গেলাম প্রথম দফাতেই। শেষ ভরসা ছিলো জাহাঙ্গীর নগর ইউনিভার্সিটি। নাবিদ সেখানে পড়াতে চাইলো না। বলল,
“বাসা থেকে এতো দূরে গিয়ে ক্লাস করতে পারবে না তুমি জরী। আর ওখানে একা থাকার তো প্রশ্নই আসে না। তুমি বরং কাছের কলেজেই পড়৷ ”
আমি মেনে নিলাম। নাবিদ ভুল কিছু বলে নি। তাছাড়া অত দূরের পথ জার্নি করা আমার পক্ষেও সম্ভব না।
আম্মা আমার পড়াশোনা মেনে নিতে পারলেন না। কিন্তু নাবিদের মুখের উপরও কিছু বলতে পারছেন না। তিনি আড়েঠাড়ে আমাকে বেশ কয়েকবার বোঝালেন যে পড়াশোনা করে আসলে লাভ কিছু নেই। শেষ অবধি রান্নাঘর ই মেয়েদের আসল জায়গা।
আমি এসব কিছুতে মাথা ঘামাই না। বাপের বাড়িতে থাকাকালীন সময় থেকেই একটা ভালো গুন আমি রপ্ত করেছিলাম। লোকের কথায় মাথা ঘামিয়ে নিজের সময় নষ্ট করব না।
মনি সারাদিন বসেই থাকে। বিকেল হলে সেজেগুজে বেরোয় পাড়ার সমবয়সী কিছু মেয়েদের সাথে। ঘন্টা দুয়েক পর ফিরে। প্রায়ই মেজাজ খারাপ থাকে। পঞ্চাশ, একশ টাকা নাবিদের কাছে চেয়ে নেয় হাত খরচের জন্য। মুক্তার পরীক্ষা শেষ হয়েছে। পড়ে পড়ে কয়েকটা দিন ঘুমালো। তারপর নেমে পড়লো সেলাই মেশিন নিয়ে। সেলাই মেশিন টা আমার মামাশ্বশুরের বাসা থেকে আনা। পুরোনো জিনিস। কলকব্জা প্রায় নষ্ট। সেটাকে পয়সা খরচ করে সারিয়ে জামা কাপড় বানায়। প্রথমে বানালো টাপুর টুপুর এর জন্য জামা। সেই জামা ওদের গায়ে বড় হয়৷ হাতা খুলে পড়ে। আমার সাথে সম্পর্ক আগের চেয়ে ভালো। গল্পটল্প করতে গেলে হাসিমুখে কথা বলে।
আমার অবশ্য গল্প করার সময় নেই। সকালে উঠেই রান্নাঘরে দৌড়াতে হয়। নাবিদের খাবার গুছিয়ে, সবাইকে খাইয়ে দাইয়ে টাপুর টুপুর কে নিয়ে স্কুলে যেতে হয়। বাচ্চাদুটো সামনের কেজি স্কুলেই পড়ে। জামিল ভাই মেয়ে দুটোর দিকে ফিরেও তাকান না। এদিকে ওদের মা’ও মেয়েদের খোঁজ খবর নেয় না। মেয়ে দুটো বড় হচ্ছে নিজেদের মতো। দাদী, ফুপুর আদরের পরিবর্তে থাপ্পড় খেয়ে বড় হচ্ছে।
এই বাড়িতে টুম্পা ভাবীর সম্পর্কে কেউই ভালো কথা বলে নি। আম্মাকে জিজ্ঞেস করায় বলেছিলেন,
“এমন বিষে ভরা মেয়ে মানুষ আমি জম্মেও দেখিনি। তার গুনকীর্তন তোমার শুনে লাভ নাই। ”
মুক্তা কে জিজ্ঞেস করার পর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিল,
“তোমার মতোই সুন্দর ভাবী। একটু অন্যরকম সুন্দর। বড়ভাই’র সঙ্গে মানায় না। মোটকথা আমাদের পরিবারে মানায় না। ”
মুক্তার এই গুণ আমাকে চমৎকৃত করেছে। টুম্পা ভাবী ভালো কী মন্দ সে আমি জানিনা। তবে এই যে দোষ টুকু সরাসরি না বলা এটা আমার বেশ লেগেছে।
নাবিদ অবশ্য ভাবীর ব্যাপারে অন্য কথা বলেছে,
“শোনো জরী, দোষ গুণ মিলিয়েই মানুষ। ভাবীর অনেক দোষ ছিলো। হয়তো মায়েরও দোষ ছিলো। তবুও মেয়েদের অনেক কিছু মানিয়ে নিতে হয়। শ্বশুর বাড়িতে চটাং চটাং কথা বলতে হয় না। ”
আমি অনেক কিছুই বুঝি না। এতসব সাংসারিক জটিলতার সম্মুখীন এখনো অবধি হয় নি সম্ভবত আমার সহজাত চুপচাপ স্বভাবের কারণে। তবুও একটা প্রশ্ন মাথার ভেতর চলতে থাকে। সেই প্রশ্নটা আমি নাবিদ কে করতে পারি না। মেনে নেয়া আর মানিয়ে নেয়ার দায়ভার কী শুধু মেয়েদেরই!
***
এই বাড়িতে আমার অনেক কিছু পাওয়ার কথা ছিলো না। তবুও পাচ্ছি তার কারণ বোধহয় টুম্পা ভাবী৷ আম্মাকে একদিন পাশের ঘরে বসে তার দু:সম্পর্কের বোন বলেছিল,
“এই বউয়ের সঙ্গে দজ্জালপানা কম দেখাইস। আগেরবারের কথা মনে আছে! ছি: ছি: ভদ্রঘরের মহিলারা জেল হাজতে থাকে!”
এই একটি কথাতেই আমার অনেক প্রশ্নের উত্তর মিলে যায়। অজান্তেই সেই মানুষটির জন্য দোয়া চলে আসে। যাকে আমি কোনোদিন দেখিও নি। আমার টাপুর টুপুর এর মা, যেখানে থাকুক ভালো থাকুক।

চলবে…

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।