পশ্চাদ্ভাগের উঠোনের দিকে দুর্দান্ত বাতাস বয়। দরজা আর জানালার উপর সেই বাতাসের ঝাপ্টা আছড়ে পড়ে। ফ্রাঙ্কলিনের কাঠের তৈরি বাড়িটা যেন ভূমিকম্পের প্রকোপে অনবরত কাঁপতে শুরু করে। এই বুঝি এখনই বাড়িটা ভেঙ্গে গুড়িয়ে পড়বে,মাটিতে মিশে যাবে। কি ভীষণ প্রলয়ঙ্কারী ঝড়!! সাথে পাল্লা দিয়ে বুকের ভেতরটাও সমানতালে কেঁপে কেঁপে উঠে। শিরদাঁড়া বেয়ে অজানা আতংকের শীতল স্রোত গড়িয়ে যায়।

ইনায়া মনে মনে অবিরত ঈশ্বরের নাম স্মরণ করে। এই সর্বনাশা বিপদ থেকে শুধুমাত্র তিনিই ওদের রক্ষা করতে পারেন। আর্নি ভয়ে ভয়ে জবুথবু হয়ে বিছানার উপর বসে। দু’হাতে শক্ত করে হাঁটুর উপর গাউন খামচে ধরে। ঠকঠকিয়ে কাঁপে।

শীতবস্ত্রের আড়ালে সিয়ার কাঁধে থাকা ক্রুশ চিহ্নটা জ্বলজ্বল করে উঠে। আগুনে পুড়ে যাওয়ার মতো জ্বালা যন্ত্রণা অনুভব করে। যখনই কোনো র’ক্তচোষা নিজের স্বরুপে সিয়ার আশে পাশে কোথাও থাকে, ঠিক তখনই ওর এরকম অনুভূতি হয়।

সিয়া নিশ্চুপ নির্বিকার ভঙ্গিমায় ঠায় দাঁড়িয়ে রয়। বাইরে থেকে ভেসে আসা লোমহর্ষক শব্দগুলো উৎকর্ণ কানে শোনে। এই ভয়ংকর পরিস্থিতিতেও সিয়া এতটা শক্ত আছে কিভাবে? ওর মধ্যে কি ভয় ভীতি বলে কিছু নেই? এতটা নিষ্প্রাণ! ঠিক যেন প্রস্তর মূর্তির মতো দেখাচ্ছে ওকে। ইনায়া ভাবে। ক্রমে ক্রমে বাতাসের বেগ বাড়ে। বাড়ির বাইরে থাকা শ’য়তানগুলো যেন দরজা জানালাগুলো সব ভেঙ্গে ফেলবে।

বাইরে কি হচ্ছে? সিয়ার দুর্দম্য কৌতুহল জাগে মনে, দেখতে ইচ্ছে করে। ওর চিত্ত চঞ্চল হয়ে উঠে। থমথমে পা ফেলে জানালার কাছে যায়। হাত বাড়ায় পর্দা সরিয়ে কপাট খুলতে। ছিটকিনিতে হাত দিতেই ইনায়া চিৎকার দিয়ে ওকে সাবধান করে বলে,,,

– জানালা খুলো না।

এই মূহূর্তে ইনায়ার বারণ শুনে না সিয়া। ওর আত্মা দুঃসাহসী হয়ে উঠে। দরজা খোলা যাবে না। কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে ওটা এমনিতেই ভেঙ্গে পড়বে। বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দে কান ঝালা পালা হয়ে আসে। জানালা খুলে দেখা প্রয়োজন, বাইরে কি হচ্ছে। প্রকৃতি কেনো এতো ভয়ংকরী হয়ে আছে? যেন বাড়িতে থাকা মানুষগুলোকে গ্রাস করতে চাইছে।

সিয়া সশব্দে জানালা খুলে ফেলে। সামনের দিকে তাকাতেই স্তব্ধ হয়ে যায়। কয়েক সেকেন্ড নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকে। অবিলম্বে ওর মুখখানা ফ্যাকাশে হয়ে উঠে। ইনায়া দৌড়ে যায়। সিয়ার পাশে দাড়ায়। খোলা জানালা দিয়ে গাঢ় অন্ধকারে কতগুলো উজ্জ্বল অগ্নি বিন্দু দেখতে পায়। বাতাসের দাপটে পশ্চাদ্ভাগের উঠোনে থাকা লন্ঠনগুলো অনেকক্ষণ আগেই নিভে গেছে। নিকষ কালো আঁধারে কয়েক জোড়া লাল টকটকে চোখ আগুনের মতো জ্বলছে। যেন ওরা দল বেধে একে অপরের সাথে যুদ্ধ করছে। সিয়া ইনায়া কেউই কিছুই বুঝতে পারে না। তবে ওরা এতটুকু বোঝে এরা সবাই রক্তচোষা পি’শাচ, যাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব বেঁধে গেছে।

প্রগাঢ় অন্ধকারে কোনো কিছু দেখা যায় না। সিয়া দরজা খোলার সিদ্ধান্ত নেয়। ঠিক তখনই ওর ডানপাশ থেকে কেউ একজন রিনরিনে কন্ঠে জিজ্ঞেস করে ওকে,,,

– তুমি কি দরজা খুলবে বলে ভাবছো?

সিয়া চমকায়। অনেকদিন পর সেই অদৃশ্য মেয়েটার কন্ঠস্বর শুনতে পায়। অকপটে জিজ্ঞেস করে,,,

– আপনি?

ইনায়া বিস্মিত হয়। সিয়া কাকে কি বলছে? অদৃশ্য মেয়েটা শান্ত গলায় বলে,,,

– তুমি এখানে একা নও। ইনায়া আর আর্নিও আছে। আমার সাথে কথা বললে ওরা দু’জনেই শুনতে পাবে। তাই নিশ্চুপ থাকো। আমি যা বলি তা মনোযোগ দিয়ে শোনো।

খোলা জানালা দিয়ে হুড়মুড়িয়ে কামরায় প্রবেশ করা বাতাসের ফলে দোদুল্যমান লন্ঠনের আলো নিভু নিভু হয়ে আসে। ডানদিক থেকে ভেসে আসা অদৃশ্য কন্ঠের কথাগুলো সিয়া উৎকর্ণ কানে শোনে। মেয়েটা বলে,,,

– স্পেল আওড়াও। বাড়ির চারদিকে শক্তিশালী সুরক্ষা ব্যারিয়ার বানাও। যা শিখেছ তা প্রয়োগ করো। আমার বিশ্বাস, তুমি পারবে। পেছনের দরজা নয়, সামনের দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে যাও।

সিয়া পাথরের মতো নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকে। ইনায়া দ্রুতহাতে জানালা বন্ধ করে পর্দা টেনে দেয়। খুব বেশিক্ষণ নয়, বড়জোর দশ মিনিট সময় ধরে বইছে এই ঝড়। এতক্ষণে বাকিরা সবাই ঘুম থেকে জেগে গেছে নিশ্চয়। বাড়ির চারদিকে শক্তিশালী ব্যারিয়ার তৈরী করতে চাইলে কামরার বাইরে যেতে হবে। সিয়া ভাবে। ব্যতিব্যস্ত কন্ঠে ইনায়াকে উদ্দেশ্য করে বলে,,,

– আর্নিকে নিয়ে এখানেই থেকো। আমি বাকিদের বলে আসি, কেউ যেন কামরার বাইরে না বের হয়।

– তুমি কোথাও যাবে না।___ইনায়া কঠিন কন্ঠে বলে।

– শান্ত হও ইনায়া। আমার কিছুই হবে না।

ইনায়া নিজের ডান হাতে সিয়ার বাম হাত শক্ত করে চেপে ধরে। নাছোড় বান্দা, ওকে যেতে দিবে না কামরার বাইরে। অকস্মাৎ সম্মুখ দরজায় করাঘাতের শব্দ শোনা যায়। ক্রিস্তিয়ান,ফ্রাঙ্কলিন, স্ট্রিকল্যান্ড এবং মাদাম ল্যারির কন্ঠস্বর ভেসে আসে। দরজায় করাঘাত করে ডাকে,,,,

– সিয়া, ইনায়া। দরজা খোলো। বাইরে প্রচন্ড বাতাস বইছে।

সিয়া আলগোছে নিজের হাত ছাড়িয়ে নেয়। দ্রুতপায়ে হেঁটে গিয়ে দরজা খুলে দেয়। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো হুরমুড়িয়ে কামরায় প্রবেশ করে। তখনো পশ্চাদ্ভাগের উঠোনে তুমুল যুদ্ধ চলছে। কতগুলো র’ক্তচোষা পি’শাচ একে অপরের সাথে লড়ছে। বারান্দার দরজা জানালাগুলোতে ক্রুশ আর রসুনের মালা ঝুলছে। এজন্যই হয়তো শয়তানগুলো এখনো কামরায় প্রবেশ করতে পারেনি। কিন্তু কতক্ষণ? এতোগুলো রক্তপিপাসুদের মাঝে এই ভয়াবহ দুর্যোগে কতক্ষণ টিকে থাকা সম্ভব হবে? সিয়া ঝুঁকি নিতে চায় না। কামরায় উপস্থিত থাকা সবার উদ্দেশ্যে থমথমে ভরাট কন্ঠে বলে,,,

– পশ্চাদ্ভাগের উঠানে আমাদের সবার জন্য মৃ’ত্যু অপেক্ষা করছে। যা কিছু হয়ে যাক, আশা করি কেউ দরজা খুলবেন না। একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজে আমি কিছুক্ষণের জন্য বাইরে যাচ্ছি।

ইনায়া বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকায়। স্ট্রিকল্যান্ড আর্নিকে বুকে আগলে বসে ছিলেন বিছানায়। সিয়ার কথা শুনে তীব্র প্রতিবাদ জানায়। রাগমিশ্রিত কন্ঠে উচ্চস্বরে বলেন,,,

– এ মেয়ে বদ্ধ উন্মাদ হয়ে গেছে।

ফ্রাঙ্কলিন, মাদাম ল্যারি সিয়াকে বোঝানোর চেষ্টা করে। ক্রিস্তিয়ান কিছু বলতে চায়। কিন্তু তাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে সিয়া দ্রুতহাতে কামরার দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে যায়। বাইরে থেকে দরজার লক আঁটকে দেয়। অতঃপর পায়ে জোর দিয়ে হাঁটে। একটুখানি দুরে যেতে হবে ওকে। কোনো কোলাহল শূন্য নিরব জায়গায়। স্পেল পড়া যেন ভুল না হয়। এবং এর যথাযথ প্রয়োগ করতে পারে।

স্বল্প সময়। যা করার দ্রুত করতে হবে। সিয়া উচ্চস্বরে ডাকে,,,

– থ্যাসো।

শুধুমাত্র একবার ডাকতেই আলোর গতিতে ছুটে আসে থ্যাসো। মাটিতে নেমে দাড়ায়। দ্রুত ওর পিঠে চড়ে বসে সিয়া। আলতো স্পর্শে গলায় হাত বুলিয়ে আদর করে দেয়। থ্যাসো অনেকটা উঁচুতে উঠে দু’ডানা মেলে শূন্য ভেসে থাকে। যেন ও ওর মনিবের মনের কথা বুঝে, সিয়ার পরিকল্পনা সম্পর্কে জানে। কি করতে হবে না বলতেই বুঝে যায় ও।

থ্যাসোর শরীর থেকে ছড়ানো তীব্র শ্বেতশুভ্র আভায় চারদিকটা কেমন দিনের আলোর মতো বর্ণোজ্জ্বল হয়ে উঠে। নিমেষেই ছড়িয়ে পড়ে পশ্চাদ্ভাগের উঠোনে যুদ্ধ করা র’ক্তচোষাদের শরীরে। মাথার উপর থেকে আসা অপার্থিব সাদা আলো যেন শয়তানগুলোর চোখ ঝলসে দিতে চায়, ওরা প্রত্যেকে দেহে অসীম অসহনীয় জ্বালা যন্ত্রণা অনুভব করে। বেশ অনেকটা উঁচুতে আকাশে কিছু একটা উড়তে দেখতে পায়। যার পিঠের উপর একটা মেয়ে বসে আছে। যুদ্ধ থামিয়ে সরু দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে অ্যাভোগ্রেডো। দুর থেকেও মেয়েটাকে চিনে নিতে সময় লাগে না তার। ওটা কি সত্যিই সিয়া? নাকি সে ভুল দেখছে?

সিয়া বেশ খানিকক্ষণ সময় নিয়ে মনে মনে স্পেল আওড়ায়। কয়েকপল সময় গড়ায়। সিয়া ওর স্পেল পড়া শেষ করে দু’হাতে একধরনের হালকা গোলাপী রঙের বলয় সৃষ্টি করে। অকল্পনীয় অপ্রত্যাশিত ভাবে প্রথমবারেই বলয় সৃষ্টি করতে পেরে সিয়া নিজেও ভীষণ হতবাক হয়। সম্পূর্ণ বাড়িটাকে ঘিরে যতদুর চোখ যায় বলয় ছেড়ে দিয়ে শক্ত ব্যারিয়ার তৈরী করে। দেখা যাক ও ওর চেষ্টায় কতটুকু সফল হতে পারে। আদৌও কি ওর পড়া স্পেল দিয়ে তৈরী এই বলয় কার্যকরী হবে? যদি না হয়? এ বাড়িতে থাকা সবগুলো মানুষের জীবনে ভয়াবহ বিপদ নেমে আসবে।

সিয়াকে অবাকের চরম শিখরে পৌঁছে দিয়ে ভাম্পায়ারগুলো সব ফ্রাঙ্কলিনের বাড়ির আঙ্গিনা থেকে অনেকটা দুরে ছিঁটকে পড়ে। কতগুলো পিঁপড়ে যেন দল বেঁধে বাতাসের বেগে উড়ে যায়। বাদ যায় না অ্যাভোগ্রেডোও। প্রত্যেকের কন্ঠনালী থেকে বীভৎস চিৎকার বেরিয়ে আসে। সিয়া হাসে। ঠোঁট বাকিয়ে ক্রুর হাসে ও। আচমকাই প্রকৃতি আবারও শান্ত নিস্তব্ধ হয়ে উঠে। থ্যাসো মাটিতে নেমে আসে। সিয়া থ্যাসোর পিঠ থেকে লাফ দিয়ে নেমে দাড়ায়। দু’হাতে থ্যাসোর গলা জড়িয়ে ধরে। কপালে কপাল রাখে। গলায় হাত বুলিয়ে দেয়। আদুরে কন্ঠে বলে,,

– ফিরে যাও।

সিয়া ওকে ছেড়ে দিয়ে পেছন ঘুরে দাড়ায়। দ্রুতপায়ে হাঁটে। থ্যাসো অদৃশ্য হয়ে যায়। সিয়া দরজা খুলে কামরায় প্রবেশ করে। ইনায়া ঝড়ের বেগে ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরে ওকে। হুহু শব্দে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। বাকিরা অশ্রুসিক্ত চোখে নিষ্পলক দৃষ্টিতে দেখে।

_______

খারকিভ, ওয়াভেল কোট।

কামরাজুড়ে অদ্ভুত নিস্তব্ধতা বিরাজ করছিলো। সাজাপ্রাপ্ত আসামির মতো মাথা ঝুঁকে দাড়িয়ে ছিলো অ্যাভোগ্রেডো। কামরার সব জিনিসপত্র ভেঙ্গে টুকরো টুকরো অবস্থায় ছড়ানো ছিটানো। এদুয়ার্দোর এমারেল্ড সবুজ চোখজোড়া রক্তবর্ণ হয়ে গেছে। মুখখানা ভয়াবহ হিংস্র। ক্রোধের আধিক্যে দপদপ করে জ্বলছিলো তার শরীরের সমস্ত শিরা উপশিরাগুলো। ফ্রাঙ্কলিনের বাড়িতে ঘটে যাওয়া সম্পূর্ণ ঘটনা তাকে জানিয়েছে অ্যাভোগ্রেডো। এদুয়ার্দোর রাজত্বে তারই সেনাদের বিরুদ্ধে ওরা যুদ্ধ করার দুঃসাহস কিভাবে পেলো? ওদের পেছনে কে আছে?

এদুয়ার্দো নিজেকে যথেষ্ট শান্ত রাখার চেষ্টা করে। এটা রেগে যাওয়ার সময় না, ঠান্ডা মাথায় ভাবতে হবে তাকে। খুঁজে বের করতে হবে এই সবকিছুর পেছনে কে আছে। তার মুষ্টিবদ্ধ রাখা হাত দু’টো ধীরে ধীরে হালকা হয়ে আসে। স্বাভাবিক হয়ে যায় দু’চোখের রঙ। সে রাজা। গহীন জঙ্গলে থাকা হিংস্র সিংহের মতো। শুধুমাত্র একটা সুযোগ, একটা সূত্র খুঁজে পেলে ধারালো থাবায় শত্রুকে ছিন্ন বিছিন্ন করে ফেলবে। উপহার দিবে নির্মম মৃ’ত্যু। দেহ থেকে মাথাটা আলাদা করতে এক সেকেন্ড সময় লাগবে না তার। পতঙ্গ যেমন আগুনের দিকে উড়ে মৃ’ত্যুকে আলিঙ্গন করে, এদুয়ার্দোর শত্রুর পরিণতিও ঠিক তুচ্ছ পতঙ্গের মতো হবে।

– ওরা সংখ্যায় কতজন ছিলো?____এদুয়ার্দোর থমথমে ভরাট কন্ঠ।

– ওরা সংখ্যায় অনেক। প্রায় এক শতাধিক হবে। আমরা ছিলাম মাত্র কয়েকজন । আমাদের সাথে লড়াই করতে করতে ওরা ফ্রাঙ্কলিনের বাড়ির পশ্চাদ্ভাগের উঠোনে পৌঁছে যায়। ভাগ্যিস বাড়ির সবগুলো দরজা জানালায় ক্রুশচিহ্ন ঝুলানো ছিলো। তাই কামরায় প্রবেশ করতে পারেনি। আমরা ওদের মোকাবিলা করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছি। কিন্তু পেরে উঠিনি। যুদ্ধের এক পর্যায়ে আকাশ থেকে আচম্বিতে এক ধরনের তীব্র সাদা রঙের আলো ছড়িয়ে পড়ে। যা আমাদের শরীরে পড়তেই চামড়া পুড়ে যাওয়ার মতো যন্ত্রণা অনুভব করি। আলোর উৎস খুঁজে পেতে আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখি, একটা সাদা রঙের ঘোড়ার উপর সিয়া বসে আছে। ঘোড়াটা দু’টো সাদা ডানা মেলে শূন্যে ভাসছে।

– ঘোড়া শূন্যে ভাসছে? কিসব আজে বাজে বকছো?____সরু দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করে এদুয়ার্দো।

– ক্ষমা করবেন। আমি সত্যি বলছি। ঘোড়াটার মাথায় কপালের মাঝখানে একটা লম্বা পেঁচানো শিং ছিলো। যা থেকে সোনালী রঙের দ্যুতি ছড়িয়ে পড়ে। এতটুকুই দেখার সুযোগ পেয়েছি। তারপর হঠাৎ করেই অদৃশ্য কিছুর সাথে ধাক্কা খেয়ে ফ্রাঙ্কলিনের বাড়ি থেকে অনেকটা দুরে ছিঁটকে পড়ি। শুধু আমি নই। সবগুলো ভাম্পায়ার সেনাদের সাথে একই ঘটনা ঘটে। অতঃপর আমাদের বিপক্ষে যুদ্ধ করা ভাম্পায়ারগুলো আবারও ফ্রাঙ্কলিনের বাড়িতে প্রবেশ করার চেষ্টা করে। কিন্তু ওরা প্রত্যেকে অসফল হয়। প্রতিবার অদৃশ্য কোনো ব্যারিয়ারের সাথে ধাক্কা খেয়ে ওদের শরীরে আগুন লেগে যায়। আমি স্তব্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে দেখি। কয়েকবার চেষ্টা করে অসফল হয়ে ওরা স্ব দলবলে পালিয়ে যায়। আমি আমার সেনাদের নিয়ে ভোর হওয়ার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত সেখানেই উপস্থিত ছিলাম।

– ওটা কোনো ঘোড়া ছিলো না। ইউনিকর্ন হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে ইউনিকর্নের কোনো অস্তিত্ব নেই। তুমি ভুল দেখেছ।___এদুয়ার্দো দৃঢ় গলায় বলে।

– অনারেবল ওভারলর্ড। শুধু আমি নই, সবাই দেখেছে। তবুও যদি মেনে নেই, ওটা আমাদের চোখের ভ্রম ছিলো, তাহলে অদৃশ্য ব্যারিয়ার কিভাবে তৈরী হলো।

– ও ডিয়েটসের নাতনি। ওর দ্বারা সুরক্ষা ব্যারিয়ার তৈরী করা অস্বাভাবিক বা অপ্রত্যাশিত কিছু নয়।

এদুয়ার্দো আরও কিছু বলবে, এমন সময় দরজায় করাঘাতের শব্দ শোনা যায়। সে অনুমতি দেয়,,,

– এসো।

দরজা ঠেলে কামরায় প্রবেশ করেন পিদর্কা স্যাভেরিন। তার তুষারের ন্যায় শ্বেতশুভ্র মুখখানা ভীষণ চিন্তিত দেখায়। পেছনে ভিক্টোরিয়া আর ক্যারলোয়েন। পিদর্কা এলোমেলো পায়ে হাঁটেন। বিচলিত গলায় ব্যথাতুর স্বরে ডাকেন,,,

– বাবা এদুয়ার্দো।

– মা! আপনি কখন এসেছেন?___এদুয়ার্দো বিস্মিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করে তাকে।

– আব্রাহাম। আমার সোনা। আমার বাবা নিথর হয়ে বিছানায় শায়িত। অথচ তুমি আমাকে একবার জানানোর প্রয়োজন মনে করোনি?___ পিদর্কা স্যাভেরিন কান্নামিশ্রিত কন্ঠে বলেন।

– তেমন কিছু না। ও খুব দ্রুত সুস্থ হয়ে যাবে। আপনি অহেতুক দুশ্চিন্তা করবেন, তাই আপনাকে জানাতে চাইনি।

– ও কেনো ফ্রাঙ্কলিনের বাড়িতে গিয়েছিলো? ওকে কে আঘাত করেছিলো? ক্রিসক্রিংগলের বড় মেয়ে ইনায়া? বলো।

এদুয়ার্দোর চোখে মুখে বিস্ময়। সে অবাক হয়। আব্রাহামকে ইনায়া আঘাত করেছিলো সেকথা তার মা কিভাবে জানলো?

– আপনাকে কে বললো?

এদুয়ার্দোর এমন প্রশ্নে পিদর্কা বেশ ভড়কে যান। তার দু’চোখে স্পষ্ট ভয় পরিলক্ষিত হয়। গলা শুকিয়ে আসে। মুখখানা আরও করুন হয়ে উঠে। আমতাআমতা করে বলেন,,,

– আমি শুনেছি। ইজাবেলের থেকে।

আব্রাহামের সাথে ঘটা ঘটনার ব্যাপারে অ্যাভোগ্রেডো আর কিছু বিশস্ত ভাম্পায়ার সেনা ব্যতীত অন্য কারো জানার কথা নয়। ইজাবেল তো এ ব্যাপারে বিন্দুবিসর্গও জানে না। তাহলে ও কিভাবে বলতে পারে? এদুয়ার্দো মনে মনে ভাবে। পেছন দিকে মাথা ঘুরিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে অ্যাভোগ্রেডোর দিকে তাকায়। যদি ইজাবেলকে কথাটা সে বলে থাকে। কিন্তু অ্যাভোগ্রেডোর দিকে তাকাতেই তার দু’চোখেও বিস্ময় খুঁজে পায়। দু’দিকে হালকা মাথা নাড়ায়। অর্থাৎ সে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে ইজাবেলকে কিছুই বলেনি। আব্রাহাম ফ্রাঙ্কলিনের বাড়িতে গিয়েছিলো ইজাবেল শুধু এতটুকুই জানে, ইনায়া আঘাত করেছিলো সেটাতো জানেনা। এদুয়ার্দো দৃষ্টি সরিয়ে নিজের মায়ের দিকে তাকায়। অকপটে বলে,,,,

– কাস্ত্রোরুজ থর্পে ডিয়েটসের বাড়িতে আক্রমণ হয়েছিলো। তার স্ত্রী আর পুত্রবধুকে হত্যা করা হয়েছিলো। আপনি এই সম্পর্কে কতটুকু জানেন?

পিদর্কা স্যাভেরিন পায়ে পায়ে এগিয়ে যান। ছেলেকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরেন। বেদনার্ত স্বরে বলেন,,,

– আমি এই মূহূর্তে কিছুই জানতে চাইনা। আমার ছেলে মৃতপ্রায়। তুমি কিনা অন্যদের কথা বলছো? আমি আব্রাহামকে আমার সাথে নিয়ে যেতে চাই। অনুমতি দাও।

– কিন্তু মা…..

– কোনো কিন্তু নয়। ও আমার কাছে থাকলে খুব দ্রুত সুস্থ হয়ে যাবে। দয়া করে মায়ের কথা রাখো। অমত করো না।

এদুয়ার্দো কোনো প্রত্যুত্তর দেয় না। নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে। দ্বিধাদ্বন্দে ভুগে। আব্রাহামকে কাছ ছাড়া করতে তার মোটেও ইচ্ছে করে না।

________

প্রাসকোভিয়া।

এখনো ভোর হয়নি। চারদিকে আবছা আলো আবছা অন্ধকার ছিলো। সুরঙ্গের দরজা থেকে একটু দুরে বেঘোরে ঘুমাচ্ছিলো মার্কস। সারা রাতে এক মূহুর্তের জন্যও দু’চোখের পাতা এক করতে পারেননি ক্রিসক্রিংগল। হৃদয় কোণে অজানা সংশয়। মার্কসের নিরাপত্তা নিয়ে ভয়। মার্টিনের সাথে দেখা করে দ্রুত বাড়িতে ফিরে যেতে হবে। আদৌও কি তিনি সফল হবেন? ক্রিসক্রিংগল ভয়াবহ দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। ভোর হতে আর কতক্ষণ সময় আছে কে জানে। তাদের দু’জনকে বন্দি করে রাখা ব্যক্তিগুলোই বা কখন আসবে?

ভাবতে ভাবতেই সুরঙ্গের দরজা খুলে যায়। ক্রিসক্রিংগল সতর্ক হয়ে উঠেন। বসা থেকে ত্বরিত দাঁড়িয়ে পড়েন। কয়েক পা পিছিয়ে যান। বেশ কিছুটা দুরত্ব বজায় রেখে দাড়ান। শক্তপোক্ত বলশালী দেহের বেশ কয়েকজন কালো পোশাকধারী ব্যক্তি দেখতে পান। প্রত্যেকের মাথায় কালো কাপড়ের পাগড়ী বাঁধা ছিলো। মুখে ত্রিকোণ কালো কাপড়ের মাস্ক। ক্রিসক্রিংগল শান্ত চোখে দেখেন। দরজা খুলে যাওয়ার শব্দে মার্কসের ঘুম ছুটে গিয়েছিলো। কয়েকজন কালো পোশাক পরিহিত ব্যক্তিকে দেখে তার গলা শুকিয়ে যায়। ক্রিসক্রিংগলের পেছনে গিয়ে দাড়ায়। ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে পরপর দু’বার দু’চোখের পল্লব নাড়ায়। সবগুলো লোকের মাঝখান থেকে একজন লোক গম্ভীর কন্ঠে বলে,,,,

– তোমাদের মা’রতে আসিনি। মা’রার হলে অনেক আগেই মে’রে ফেলতাম। মহামান্য মাস্টারের আদেশ, তোমাদের দু’জনকে জীবিত অবস্থায় তার কাছে নিয়ে যেতে হবে।

ক্রিসক্রিংগল নিশ্চুপ, নির্বাক। তাকে পেছন থেকে দু’হাতে জাপ্টে ধরে থাকে মার্কস। ছেলেটা ভীষণ ভয় পায়। মৃ’ত্যু ভয়। এই সুন্দর পৃথিবীতে এতো তাড়াতাড়ি মরে যেতে চায় না সে।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।