সুদীর্ঘ সবুজ অরণ্য আর সুবিশাল নীলাভ আকাশের অলৌকিক সৌন্দর্যে চোখ জুড়িয়ে যায়। ক্ষণে ক্ষণে প্রকৃতির রঙ বদলায়।

ভয়াল, ভয়ংকর রাত্রি আর দুর্গম পথযাত্রা শেষ করে ফিটন দু’টো প্রাসকোভিয়া জঙ্গলে প্রবেশ করে। শতাব্দী পুরনো অদ্ভূতুরে দানবীয় গাছগুলো দেখে ভয় আর শঙ্কায় গলা শুকিয়ে মরুভূমির মতো হয়। দিনের আলোতেও ভয়াবহ গা ছমছমে ভয়।

সত্যিই জঙ্গলটা ভীষণ রহস্যময়। চারদিক থেকে কেমন অদ্ভুদ শব্দ শোনা যায়। মনে হয়, জঙ্গলে থাকা গাছগুলোও হিংস্র চোখে ওদের দিকে তাকিয়ে আছে। এই বুঝি প্রত্যেকের ঘাড় মটকে দিবে। অথবা বৃহৎ হা করে এখুনি গিলে ফেলবে সবাইকে। সবুজ পাতার গায়েও যেনো ভয়াবহ আতংকের ছাপ লেগে আছে। একফোঁটা সূর্যের আলো প্রবেশ করার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই। যেহেতু প্রাসকোভিয়া থেকে ইম্যুভিল পর্যন্ত সম্পূর্ণ অঞ্চলটুকু শীতপ্রধান। তাই সবগুলো গাছপালা আর জঙ্গলের মাটিতে শীতল বরফের গাঢ় আস্তরণ জমে গেছে।

ইনায়ার দেহে সাদা রঙের একটি উলের চাদর জড়ানো ছিলো। চাদরের একপাশের অংশ দিয়ে সিয়ার শরীর ঢেকে দিলো। অন্যপাশটা নিজের গায়ে জড়িয়ে নিলো।

ফিটন চলতে চলতেই হঠাৎ ঘোড়া দু’টো বাঁধন মুক্ত হয়ে ছুটে পালাল। সিয়ার কাঁধে থাকা ক্রুশ চিহ্নটা জ্বলজ্বল করে উঠল। ইনায়ার কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিলো ও। প্রাসকোভিয়ায় প্রবেশ করে কিছুটা পথ অতিক্রম করার পর আচম্বিতে এমন ঘটনা ঘটলো। পালিয়ে গেলো সামনের ফিটনের ঘোড়া দু’টো।

ক্রিস্তিয়ান নিজের ফিটন রেখে ঘোড়া দু’টোর পেছনে দৌড়াতে শুরু করলো। তার পেছনে ছুটে গেলো কোচওয়ান। আবারো নতুন বিপদ। এই দীর্ঘ সময়ের যাত্রা খুব একটা সহজ ছিলো না। যদিও এখন দিনের বেলা, তবুও ক্রিসক্রিংগলের ভয় হচ্ছিলো। তিনি ফিটন থেকে নেমে দাঁড়াতে চাইলেন। কিন্তু দ্বিতীয়বারের মতো সিয়ার কাঁধে থাকা ক্রুশচিহ্নটা জ্বলতে দেখতে পেলেন। দিনের আলোতে ওটার জ্বলজ্বলে আলোটা কম। প্রথমবারের মতই একবার জ্বলে উঠে সাথে সাথে নিভে গেলো। ইনায়া স্তম্ভিত হলো। বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে ওর বাবার দিকে তাকালো।

– আমি যা দেখেছি, তুমিও কি তাই দেখেছো?___অকপটে জিজ্ঞেস করলেন ক্রিসক্রিংগল।

– মনে হলো ক্রুশচিহ্নটা জ্বলজ্বল করে উঠলো।

আর্নি বোকার মতো তাকিয়ে রইলো। দু’জনের মধ্যে হওয়া কথোপকথনের কিছুই বুঝতে পারলো না ও। অদ্ভুতভাবে ক্রুশচিহ্নটা আবারও জ্বলজ্বল করে উঠল। আর্নি স্পষ্ট দেখতে পেলো। একবার জ্বলে আবার নিভে গেলো। বেশ কিছুক্ষন এরকম চলতে থাকল। আর্নি, ইনায়া, ক্রিসক্রিংগল তিনজনেই বিস্ময়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলো। হঠাৎ নড়ে চড়ে উঠলো সিয়া। ওর কর্ণকুহরে বেজে উঠলো সাপের হিসহিসানির শব্দ। হুতুম পেঁচার লোমহর্ষক ডাক। অস্পষ্ট স্বরে কেউ ফিসফিসিয়ে বলল,

– ফ্লোরেনসিয়া! প্রাসকোভিয়ায় তোমাকে স্বাগতম। কতগুলো বছর অধীর আগ্রহে তোমার অপেক্ষায় প্রহর গুনছিলাম। অথচ এভাবে চলে যাচ্ছো? ফিটন থেকে নেমে দাঁড়াও। আমার কাছে এসো।

মনে হলো কেউ ইচ্ছে করে ফিটন থেকে ঘোড়া দু’টোর বাঁধন উন্মুক্ত করে দিয়েছিলো। ক্রিস্তিয়ান আর কোচওয়ানের দেখা মিললো না কারো। হিমশীতল আবহাওয়াতেও সিয়ার শরীর ঘামতে লাগল। ঘুমের ঘোরে অস্ফুট স্বরে গোঙ্গাতে শুরু করল। নিজের অজ্ঞাতেই ভীষণ ভয় পেলো। কন্ঠস্বরটা কেমন যেনো।গায়ের লোম দাঁড়িয়ে গেলো। মনের কোণে ভয়াবহ ভীতিপ্রদর্শন করলো।

– ফ্লোরেনসিয়া। নেমে এসো, নেমে এসো ফিটন থেকে।

লম্বা, সাদা গাউন পরিধেয় বাদামী চোখের একজন সুন্দরী মেয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো। মাথায় ঝকঝকে শ্বেত পাথরের ক্রাউন পরেছে সে। যার অবিনস্ত উজ্জ্বল বাদামী চুলগুলো ছিলো অসম্ভব লম্বা। মাটিতে লুটোপুটি খাচ্ছে। মুখজুড়ে কি অদ্ভুত মায়া! সিয়াকে ডান হাতের দু’আঙ্গুলের ইশারায় নিজের কাছে ডাকছে।

সিয়া ভয় পেলো। ভীষণ ভয় পেলো মেয়েটার পেছনে উঁচু ডালের উপর ঝুলে থাকা বিশালাকৃতির সবুজ অ্যানাকোন্ডা দেখে। হঠাৎ সেই ভয়ংকর সাপটা বৃহৎ হা করে ওর দিকে তেড়ে আসে। সিয়া চিৎকার দিয়ে উঠে,

– মা!

ক্রিসক্রিংগল ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লেন। সিয়া অস্পষ্ট স্বরে বলল,

– পানি, পানি খাবো।

ক্রিসক্রিংগল সিয়ার পাশে বসলেন। ইনায়া পানি এগিয়ে দিলো। সিয়া ঢকঢক করে পানি পান করল। আর্নি ব্যস্ত, বিচলিত কন্ঠে জানতে চাইলো ,

– কোনো দুঃস্বপ্ন দেখেছিস?

স্বপ্ন ছিলো না। যেনো সম্পূর্ন বাস্তব ছিলো ওটা। সিয়া কোনো উত্তর দিতে পারল না। আশে পাশে নজর বুলালো। অনুচ্চ স্বরে বললো,

– ফিটনে বসে থাকতে থাকতে আমার দমবন্ধ হয়ে আসছে। আর কতক্ষণ সময় লাগবে বাবা?

– এতোক্ষণে ইম্যুভিলে পৌঁছে যেতাম আমরা। কিন্তু হঠাৎ করে ফিটনের বাঁধন মুক্ত হয়ে ছুটে পালিয়ে গেছে ঘোড়া।

বলতে না বলতেই ঘোড়া দু’টো সাথে নিয়ে ফিরে এলো ক্রিস্তিয়ান আর কোচওয়ান। ফিটনের সাথে ঘোড়াগুলোকে বেঁধে পুনরায় যাত্রা শুরু করলো তারা। সিয়ার কাছে সবকিছুই কেমন ধোঁয়াশা লাগছিলো। বিশেষ করে নিজের কাঁধের উপর থাকা ক্রুশচিহ্ন জ্বলজ্বল করে উঠা, বিপদের আভাস পাওয়া, ঘুমের ঘোরে এমন একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখা। সবকিছুই রহস্যময় মনে হলো।

যেখানে সকাল বেলায় ইম্যুভিলে পৌঁছে যাওয়ার কথা ছিলো, সেখানে জঙ্গলের মাঝেই সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়ে গেলো। প্রাসকোভিয়ার গহীন জঙ্গলে সবুজে-ঘেরা সুরঙ্গের মতো আঁকা বাঁকা পথ অতিক্রম করতেই দেখা মিললো সুউচ্চ পাহাড়গুলোর।

দূর পাহাড়ের উপর ধূসর রঙের মেঘ। মেঘগুলো যেন পাহাড়ের গা ঘেঁষে উড়োউড়ি করছিলো। সিয়া ফিটনের জানালা দিয়ে নিষ্পলক চোখে বাইরে তাকিয়ে রইলো। ইতোমধ্যে আরো ঠান্ডা লাগছিলো ওর।

পথের দু’ধারে সারি সারি অসংখ্য দানবীয় গাছপালা। হিমশীতল বাতাস বইছিলো। গাছগুলো থেকে টুপটাপ বৃষ্টির মতো তুষার ঝরে পড়ছিলো। পাহাড়গুলোতে দেখা যাচ্ছিলো শ্বেতশুভ্র বরফ আস্তরণ। সকালে উঠা সূর্যের তাপে সেগুলো গলে যাচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে সূর্যটা মেঘের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল। বেশ কিছুক্ষন নিরবতায় কেটে গেলো। হঠাৎই সিয়াকে ডেকে উঠলেন ক্রিসক্রিংগল,

– সিয়া।

ক্রিসক্রিংগলের ডাকে সম্বিত ফিরে পেলো সিয়া। স্পষ্ট কন্ঠে প্রত্যুত্তর দিলো,

– জ্বি?

– প্রথমবার তুমি বামদিকের রাস্তা ধরে ফিটন নিয়ে আসতে বলেছিলে। দ্বিতীয়বার পথিমধ্যে হঠাৎ করে যখন ফিটন থেমে গেলো। আমি ফিটন থেকে নামতে চাইলে তুমি আমাকে বাঁধা দিয়েছিলে। আমার একহাত শক্ত করে আঁকড়ে ধরে চোখের ইশারায় ফিটন থেকে নেমে দাঁড়াতে বারন করেছিলে। তুমি কি তখনো কোনো বিপদের আভাস পেয়েছিলে?

সিয়া দু’চোখের পল্লব নাড়ালে একবার। গভীর দীর্ঘশ্বাস টেনে নিল। ওর মুখখানা ভীষণ শুকনো। চাহনি নিষ্প্রাণ, অনুভূতিশূন্য।

– তাহলে বলোনি কেনো? সামনে বিপদ।___বিস্মিত কন্ঠে জানতে চাইলেন ক্রিসক্রিংগল।

– আপনি সুযোগ দেননি। তাছাড়া বলেই বা কি এমন লাভ হতো? দ্বিতীয় কোনো রাস্তা ছিলো না। তাই বিপদের সম্মুখীন হতে প্রস্তুত ছিলাম।

ক্রিসক্রিংগল নিশ্চুপ হয়ে গেলেন। সিয়াও আর কোনো কথা বললো না। ওর মস্তিষ্ক দাপিয়ে বেড়াচ্ছিলো কতশত প্রশ্ন। অথচ উত্তর মিললো না কোনো। পাহাড়ি রাস্তার মসৃন বরফের উপর দিয়ে ক্রমাগত ফিটন ছুটে চললো।

দূরে অসংখ্য ছোট ছোট বাড়ি দেখা যাচ্ছিলো। ওটা অন্যগ্রাম। নিজের ভাবনা থেকে বেরিয়ে এলো সিয়া। সুদীর্ঘ গহীন জঙ্গল পেরিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস টেনে নিলো। মনে হলো, প্রাসকোভিয়া ওকে নিজের বুকের গহ্বরে টেনে নিতে চেয়েছিলো। যেন সিয়া প্রকৃতির সন্তান।

দেখতে দেখতে ওরা ইম্যুভিলের সীমানায় পৌঁছে গেল। জনপদ খুঁজে পেলো। কাঠের তৈরী অসংখ্য বাড়ি ঘর দেখা যাচ্ছিলো। কোনোটা একতলা, কোনটা দোতলা ভবন। মাঝে মাঝে দু’একটা ইট পাথরের দালানও দেখা গেলো।

– এখানে প্রচন্ড শীত। —– বলে শরীরে জড়িয়ে থাকা চাদরটা আরও একটু শক্ত করে জড়িয়ে নিলো ইনায়া।

– এ অঞ্চল শীতপ্রধান। বছরের অধিকাংশ সময় সম্পূর্ন অঞ্চল বরফে ঢাকা থাকে। সূর্যের দেখা মেলা দুষ্কর।

– কিন্তু আমাদের কাছে পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র নেই।— ম্লান কন্ঠে বলল ইনায়া।

– ভেবো না। বাজারে পৌঁছে সব প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে নেওয়া যাবে। প্রথমে থাকার জন্য একটা বাড়ি ভাড়া নিতে হবে।

কোচওয়ান বাজারের দিকে ফিটন ঘুরিয়ে নিলো। এই অঞ্চলটা চিনে না সে। বহু বছর আগে ক্রিসক্রিংগল এসেছিলেন। তিনিই কোচওয়ান আর ক্রিস্তিয়ানকে রাস্তা দেখিয়ে দিলেন।

প্রায় দেড় যুগ পর ইম্যুভিলে পা রাখলেন ক্রিসক্রিংগল। অনেক কিছুই বদলে গেছে। এসেছে নতুনত্বের ছোঁয়া। গ্রামের এতটুকু রাস্তায় খুব একটা মানুষ দেখা না গেলেও, বাজারে পৌঁছাতেই অনেক লোকজনের ভিড়ের সম্মুখীন হলো তারা।

সারিবদ্ধ অসংখ্য দোকান। নিত্য প্রয়োজনীয় ভিন্ন ভিন্ন সব দ্রব্য-সামগ্রী নিয়ে বসে আছে লোকজন। এখানের অধিকাংশ মানুষ রুশভাষী। বাজারের এক কোণায় ফাঁকা জায়গা দেখে ফিটন দাঁড় করালো কোচওয়ান।

– তোমরা এখানেই বসে থাকো। ফিটন থেকে বাইরে বের হবে না। আমি সিয়াকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাচ্ছি। দ্রুত ফিরে আসব। ওর হাতের ক্ষতটা বেশ গাঢ়।

– আপনি তো এখানের কোনো কিছুই চিনেন না। — ইনায়া বলল।

– কাউকে জিজ্ঞেস করে নিবো।

– লাগবে না। আমি ঠিক আছি। সামান্য ক্ষত। এমনিতেই সেরে যাবে।

ক্রিসক্রিংগল সিয়ার কথায় কর্ণপাত করলেন না। ক্রিস্তিয়ান আর স্ট্রিকল্যান্ডকে রেখে ওকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবেন। ফিটন থেকে নেমে দাঁড়ালো সিয়া। অন্য ফিটন থেকে হুডি জ্যাকেট বের করে গায়ে জড়িয়ে নিলো। এই কয়েক দিনেই কেমন তরতরিয়ে বেড়ে গেছে ওর বাদামী চুলগুলো। যা কোমর ছাড়িয়ে গেছে। এভাবে চলতে থাকলে স্বপ্নে দেখা মেয়েটার মতো হবে। এতো লম্বা চুল নিয়ে ঐ মেয়েটা হাঁটাচলা করে কিভাবে? মেয়েটা কি মানুষ নাকি কোনো স্বর্গীয় দেবী ছিল? ঠিক যেন গ্রীক দেবীদের মতো সুন্দর দেখতে। সিয়া ভাবল। ভাবতে ভাবতেই নিজের প্রতি বেশ বিরক্ত বোধ করলো। কিসব আজে বাজে কথা ভাবছে! এখন কি এসব ভিত্তিহীন বিষয় নিয়ে ভাবার মনমানসিকতা বা সময় আছে?

পড়ন্ত বিকেল। বেশ কোলাহল চারদিকে। বসে থাকতে থাকতে হাঁপিয়ে উঠল ইনায়া। ভীষণ অস্বস্তি লাগছে। ফিটন থেকে নেমে দাঁড়াল। ম্যানহলের সরু রাস্তা ধরে পায়চারি করতে শুরু করল। হাঁটতে হাঁটতে খানিকটা সামনে এগিয়ে গেল। ক্রিস্তিয়ান উচ্চস্বরে ডাকলো। সতর্ক করে বললো,

– ইনায়া! ওদিকে যেও না।

– আমি এখানেই। বেশি দূরে যাবো না।

হঠাৎ ইনায়ার পাশ দিয়ে কিছু একটা হাওয়ার বেগে ছুটে গেলো। ইনায়ার শরীরে বাতাসের তীব্র ঝাপটা এসে লাগলো। চোখ মুখ কুঁচকে বন্ধ করে ফেলল। অনেক দূর পর্যন্ত গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল আব্রাহাম। ত্বরিত পেছন ফিরে তাকালো। চোখ বন্ধ করে একটা মেয়েকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভ্রু কুঁচকালো। মেয়েটা দু’চোখের পল্লব মেলে তাকালো সামনের দিকে। আব্রাহাম থমকালো। সেই গাঢ় ধূসর রঙা চোখদু’টো। সুদীর্ঘ লালচে-সোনালী চুলের মেয়ে। আব্রাহাম অস্ফুট স্বরে বললো,

– ইনায়া ইবতিসাম! এখানে?

ক্ষণকাল সময় গড়ালো। নিজের চোখ দু’টোকেও বিশ্বাস করতে পারল না আব্রাহাম। এর আগেও বহুবার ধোঁকা দিয়েছিলো তার চোখ। ইনায়া দৃষ্টি ঘুরিয়ে আশেপাশে নজর বুলালো একবার।

আব্রাহাম দু’আঙ্গুলে নিজের চোখ দু’টো কচলে পুনরায় মেয়েটার দিকে তাকাল। এবারও ইনায়াকে দেখতে পেলো। বিশ্বাস করতে কষ্ট হলো। ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করছিল। নিজের অজান্তেই পায়ে পায়ে এগিয়ে যাচ্ছিল সে। কিন্তু ইনায়াকে আড়াল করে দাঁড়ালো ক্রিস্তিয়ান। আব্রাহামের রাগ হলো। কেনো ইনায়াকে আড়াল করে দাঁড়ালো ছেলেটা? সে নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলো,

– ইনায়া এখানে কি করছে? ওর সাথে থাকা ছেলেটা কে?

এই একটা মেয়ে। যে কিনা আব্রাহামের ধরা ছোঁয়ার বাইরে। জীবনে কতগুলো মেয়ের সাথে মিশেছে! কত মেয়ের সাথে ইন্টিমেট হয়েছে তার হিসাবও রাখেনি সে। একবার অন্তরঙ্গ হওয়া মেয়েগুলোর মুখ দেখেনি দ্বিতীয়বার। শুধু পামেলাই তার সাথে দু’বার ঘনিষ্ঠ হয়েছিলো। মেয়েটা এখনো আছে দুভিল কোটে। অথচ আব্রাহাম কখনো ফিরেও তাকায় না ওর দিকে। ইনায়ার সাথে দেখা হওয়ার পর আর কোনো মেয়েকে মনে ধরেনি তার। কিন্তু কেনো? হঠাৎ করেই সে সাধু পুরুষ হয়ে গেলো কিভাবে? ভেবে নিজেই নিজেকে ঝারি মারল। মনে মনে বললো,

– আমিও কি ওভারলর্ডের মতো হয়ে গেছি? সুন্দরী মেয়েদের ছেড়ে শুধুমাত্র র’ক্তে আসক্ত হয়ে পড়েছি! সবকিছুর পেছনে ও দায়ী। ওর র’ক্ত খাওয়ার পর থেকেই আমার এমন শোচনীয় অবস্থা হয়েছে। এর শাস্তি পেতে হবে ওকে।

এরই মাঝে ক্রিসক্রিংগল আর সিয়া ফিরে এলো। আব্রাহাম দূরে দাঁড়িয়ে সবটাই দেখছিলো। ইম্যুভিলে একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজে এসেছিলো, সেকথা যেনো বেমালুম ভুলে গেলো।

ক্রিসক্রিংগলের হাতে বেশ কিছু জিনিসপত্র ছিলো। সিয়ার দু’হাতে ব্যান্ডেজ। ইনায়ার সামনে এসে দাঁড়ালো দু’জনে। আব্রাহাম কপাল কুঁচকে সরু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। এই মানুষগুলোকে দেখেছিলো সেদিন ম্যাথস তৃণভূমিতে।

– এরা কি ইনায়ার পরিবারের সদস্য?____আব্রাহাম মনে মনে ভাবলো।

সিয়ার মুখের একপাশটা শুধুমাত্র দেখা যাচ্ছিল। বাকিটা হুডি দিয়ে ঢাকা ছিলো। ক্রিসক্রিংগল তার হাতের জিনিসপত্রগুলো ফিটনের ভেতরে রাখলেন। আর্নি আর স্ট্রিকল্যান্ড সাহায্য করল তাকে। ক্রিসক্রিংগল পেছন ফিরে দাঁড়াতেই একজন লোককে দেখতে পেলেন। অতি কষ্টে ধীরপায়ে হেঁটে একজন জরাজীর্ণ বৃদ্ধ ক্রিসক্রিংগলের সামনে এসে দাঁড়ালেন। লম্বা মতো লোকটা রোগা আর বেশ দুর্বল দেখতে। কিঞ্চিৎ কুঁজো হয়ে আছেন। মুখ ভর্তি খোঁচা খোঁচা শ্বেতশুভ্র দাড়ি আর পাংশুটে ঠোঁট। দু’চোখের ভারি পল্লবে অর্ধেক বুজে আছে চোখ। বারকয়েক ঘনঘন শ্বাস নিলেন বৃদ্ধ। সরু চোখে ক্রিসক্রিংগলের দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। অতঃপর অনুচ্চস্বরে ডাকলেন,

– ক্রিসক্রিংগল?

ক্রিসক্রিংগল চিনতে পারলেন না। চেনার চেষ্টা করলেন। কয়েক সেকেন্ড সময় গড়াল। হঠাৎই আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল তার চোখ।

– জনাব পিয়ারসন! আপনি ফ্রাঙ্কলিন পিয়ারসন?

সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়ালেন বৃদ্ধ। তার কুঁচকে যাওয়া চামড়ার ডান গাল বেয়ে একফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। ক্রিসক্রিংগলের হাস্যোজ্জ্বল মুখখানা মুহূর্তেই বিষাদে ভরে গেলো। তিনি কাতর কন্ঠে বললেন,

– আমি শুনেছিলাম আপনি মা’রা গেছেন।

– না, আমি তখন ইম্যুভিলে ছিলাম না।

– আপনার স্ত্রী মাদাম ল্যারি?

– ঈশ্বরের দয়ায় দু’জনেই বেঁচে আছি। কিন্তু এতোগুলো বছর পর হঠাৎ তুমি?

– সে অনেক কাহিনি। কাস্ত্রোরুজ ছেড়ে এসেছি। এখানেই থাকবো। আপনার জানা শোনা কোনো ভালো বাড়ি পাওয়া যাবে?

বিস্মিত হলেন ফ্রাঙ্কলিন। কিছু একটা জিজ্ঞেস করতে গিয়েও থেমে গেলেন। একটুখানি দূরে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়ে দু’টোকে দেখলেন। একটা মেয়েকে দেখে তিনি ভীষণ চমকে উঠলেন। ডান হাতের তর্জনী আঙ্গুলির দ্বারা মেয়েটাকে দেখিয়ে উদ্বিগ্ন কন্ঠে জানতে চাইলেন,

– ও কে?

– ফ্লোরেনসিয়া। আমার ছোট মেয়ে। ওর পাশের জন ইনায়া ইবতিসাম। আমার বড় মেয়ে।

– ফ্লোরেনসিয়া?

– জ্বি।

বৃদ্ধ ফ্রাঙ্কলিনের দু’চোখ থেকে পুনরায় অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। তিনি আবেগে আপ্লূত কন্ঠে বললেন,

– বাড়ি ভাড়া নেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। আমার নিজেরই কতবড় বাড়ি খালি পড়ে আছে। আমাদের বৃদ্ধ-বৃদ্ধার কামরা ছাড়াও আরও চারটে কামরা আছে তাতে। তোমরা অনায়াসেই থাকতে পারবে।

ক্রিসক্রিংগল দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগলেন। সবাই মিলে এভাবে কারো বাড়িতে কিভাবে থাকতে পারেন? তিনি দ্বিমত প্রকাশ করে বললেন,

– তা কি করে হয়? আপনি বরং একটা ভালো বাড়ি খুঁজে দিন।

– অমত করো না। ওতো বড় বাড়িতে আমরা দু’জন ভীষণ নিঃসঙ্গ বোধ করি। যদি তোমরা আমাদের সাথে থাকো। খুব খুশি হবো।

এদিকে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এলো। সাথে তিন তিনটে যুবতী মেয়ে। অচেনা জায়গা। চেনা পরিচিত কেউ নেই। বাড়ি খুঁজে পাওয়া খুব একটা সহজ হবে না। তন্মধ্যে ফ্রাঙ্কলিন যখন এতো করে বলছেন, সবকিছু ভেবে চিন্তে অবশেষে ক্রিসক্রিংগল রাজি হলেন।

ক্রিস্তিয়ান, ইনায়া আর সিয়াকে ডেকে নিলেন। ফিটনে চড়তে বললেন। আব্রাহাম তখনো দূরে দাঁড়িয়ে থেকে দেখছিল। সিয়া, ইনায়া ওদের বাবার কাছে এগিয়ে এলো। ক্রিসক্রিংগল ম্লান হেঁসে বললেন,

– চলো। থাকার জন্য আশ্রয় খুঁজে পেয়েছি। তোমাদের এই দাদুর বাড়িতে।

দেরি না করে কোচওয়ানের আসনে গিয়ে বসে পড়ল ক্রিস্তিয়ান। তার পাশে বসলেন স্ট্রিকল্যান্ড। অন্য ফিটনের কোচওয়ানের পাশে বসলেন ফ্রাঙ্কলিন পিয়ারসন। সবাইকে সাথে নিয়ে রওনা দিলেন নিজের বাড়ির দিকে। আব্রাহাম এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে দেখছিল সবকিছু। কোচওয়ান ঘোড়া ছুটাতেই ওদের পিছু নিলো সে। মনে মনে ঠিক করলো, ইনায়া কোথায় যাচ্ছে দেখতে হবে তাকে।

—————★

খারকিভ, ওয়াভেল কোট।

অন্ধকার রাত। দুর্গের সবচেয়ে উঁচু টাওয়ারের রুফটপে দাঁড়িয়ে আছে এদুয়ার্দো। মিষ্টি মধুর বাতাস বইছিলো। দুর্গের বাইরে লম্বা লম্বা গাছগুলো নুয়ে পড়েছিল। ভারি হয়ে নেমে আসা কালোমেঘ থেকে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি ঝরছিল। দাঁড়িয়ে থেকে মুহূর্তটা উপভোগ করছিলো এদুয়ার্দো। কিন্তু হঠাৎই দূর থেকে গির্জার ঘন্টাধ্বনি ভেসে এলো। শব্দ টা যেন তার কানে, গলে যাওয়া গরম লোহা ঢেলে দেওয়ার মতো লাগলো।

এদুয়ার্দোর পি’শাচ হৃদয় ভীষণ ক্রোধিত হলো। এই অঞ্চল তার অধীনে আসার পর থেকে আশেপাশে কোথাও গির্জার ঘন্টাধ্বনি বাজতে দেয়নি সে। চার্চগুলোতে নিযুক্ত কোনো যাজক টিকতে পারেনি দু’দিন। কিন্তু বেশ অনেক দিন হলো একটা চার্চ থেকে ঘন্টাধ্বনির শব্দ ভেসে আসে। একদিন সেই চার্চের যাজককে হুমকিও দিয়েছিলো অ্যাভোগ্রেডো। কিন্তু যাজক শুনেননি। ভয় পাননি একটুও। বরং অ্যাভোগ্রেডোকে নাস্তানাবুদ করেছিলেন। লোকটা নিজের জীবনের পরোয়া করেনা।

– অনারেবল ওভারলর্ড।

এদুয়ার্দো পেছন ঘুরে দাঁড়ালো। কালো কুচকুচে ট্রেঞ্চকোট পরিধেয় আব্রাহামকে দেখতে পেলো। বুকের উপর ডান হাত মুষ্টিবদ্ধ রেখে নত মস্তকে দাঁড়িয়ে ছিলো। অন্ধকারে এদুয়ার্দোর দু’চোখের মনি জ্বলজ্বল করে উঠল। আব্রাহামের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসলো। তাচ্ছিল্য মেশানো কন্ঠে বললো,

– আমার অপদার্থ ভাই! কাজটা সম্পূর্ণ করেছো?

আব্রাহামের রাগ হলো। অপদার্থ শব্দটা তার আত্মসম্মানে জোরালো আঘাত হানলো। রাগান্বিত চোখে তাকালো। কিন্তু এদুয়ার্দোর মুখের দিকে তাকাতেই তার সমস্ত রাগ দপ করে নিভে গেলো। এদুয়ার্দো রাশভারী কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,

– আমার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছো না কেনো?

আব্রাহাম কিছু বলবে তন্মধ্যে অ্যাভোগ্রেডো চলে এলো। এসেই প্রথমে এদুয়ার্দোকে নত মস্তকে সম্মান জানালো। শ্রদ্ধা ভরে ডাকলো,

– অনারেবল ওভারলর্ড।

অতঃপর আব্রাহামের দিকে তাকিয়ে সহাস্যে বললো,

– এস্টীম রুলার।

আব্রাহাম চোখের পলক ফেললো। অ্যাভোগ্রেডো এদুয়ার্দোকে উদ্দেশ্য করে সবিনয়ে বললো,

– অনারেবল ওভারলর্ড। শ্যারনের কামরায় একটা চিঠি পাওয়া গেছে। যেটাতে এক লাইনের একটি বাক্য লেখা ছিলো।

এদুয়ার্দো কপাল কুঁচকালো। অ্যাভোগ্রেডো বললো,

– লেখা ছিলো “সময় মতো উইজার্ড ডিয়েটসের বাড়িতে পৌঁছে যেও”।

আব্রাহামের ভ্রু কুঞ্চিত হলো। মনে মনে ভাবলো,

– ডিয়েটসের বাড়িতে শ্যারনের কি কাজ ছিলো? কে ওকে ইনায়াদের বাড়িতে যেতে বলেছিলো?

– এখনই কাস্ত্রোরুজে যাও। সব ধরনের খোঁজ-খবর নিয়ে এসো। তোমাকে বলেছিলাম এসব ছোট খাটো বিষয়ে আমার আদেশের অপেক্ষায় থাকবে না। —–এদুয়ার্দো রাগান্বিত কন্ঠে বললো।

– ক্ষমা করবেন। আমি গিয়েছিলাম কাস্ত্রোরুজ থর্পে। উইজার্ড ডিয়েটসের বাড়িতে। কিন্তু কাউকে খুঁজে পায়নি। সবগুলো কামরার দরজা খোলা ছিলো। অথচ সম্পূর্ণ বাড়িতে কেউ নেই। আশে পাশের মানুষগুলোকে জিজ্ঞেস করে জানতে পেরেছি, ডিয়েটসের বাড়িতে তার পুত্রবধু, সহধর্মিণী আর সাসোলি কুরী নামের একজন রমনী র’ক্তপিপাসুদের হাতে নৃশংসভাবে খু’ন হয়েছিলেন। তাদের সমাধিস্থ করার পর ডিয়েটসের বাড়ির রাস্তায় তিনটে ফিটন দাঁড়িয়ে ছিলো। হয়তো দুই মেয়ে আর কুরী পরিবারের বাকি তিন জনকে সাথে নিয়ে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে গেছেন ক্রিসক্রিংগল।

অসামান্য ক্রোধে এদুয়ার্দোর চোখজোড়া রক্তবর্ণ হয়ে উঠলো। ভীষন চমকালো আব্রাহাম। বুঝতে পারল ইনায়াদের ইম্যুভিলে যাওয়ার কারন। কিন্তু চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। মুখ দিয়ে একটাও শব্দ বের করলো না।

– এতো বড় দুঃসাহস? আমার অনুমতি ছাড়া কাস্ত্রোরুজে নৃশংসতা চালিয়েছে কে? খুঁজে বের করো।____এদুয়ার্দোর ক্রুদ্ধ কন্ঠ।

আব্রাহাম তাচ্ছিল্য ভঙ্গিমায় হাসলো। বিদ্রুপাত্মক স্বরে বললো,

– ভ্যাম্পায়ারদের ওভারলর্ড, ক্লীভল্যান্ড এদুয়ার্দো স্যাভেরিনের অগোচরে এতোকিছু হয়ে গেলো। অথচ তিনি জানতেই পারলেন না! বিষয়টা হাস্যকর। নিন্দনীয়ও বটে। অথচ তিনি অন্যকে অপদার্থ বলে সম্বোধন করেন।

এদুয়ার্দোর ক্রোধ বাড়লো। যেনো আক্রোশের অনলে জ্বলছিল তার হৃদপিণ্ড। একহাত মুষ্ঠিবদ্ধ করে আব্রাহামের চিবুকে ঘুষি মা’রল। ঠোঁট ছড়িয়ে হাসলো আব্রাহাম। ঠোঁটের ভাঁজে হাসিটুকু বজায় রেখে বললো,

– আত্মসম্মানে লেগেছে? আমারও লেগেছিলো।

– এখনই দূর হয়ে যা আমার চোখের সামনে থেকে।___এদুয়ার্দো ভয়ংকর ক্রুদ্ধ কন্ঠে হুংকার দিয়ে বললো।

আব্রাহাম আর একমুহূর্তও দাঁড়ালো না। ধোঁয়ার কুন্ডলী পাকিয়ে বাতাসে মিলিয়ে গেলো। অ্যাভোগ্রেডো ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পাথরের মূর্তির মতো ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো।

————–★

ইম্যুভিল, ফ্রাঙ্কলিনের বাড়ি।

রাত দশটা বাজে তখন। দেয়াল ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে সিয়া আর আর্নিকে শুয়ে পড়তে বললো ইনায়া। ফ্রাঙ্কলিনের বাড়িতে সন্ধ্যার আগেই পৌঁছে গিয়েছিলো ওরা। বাড়িটা পাহাড়ের ধারে।ইউ আকৃতির একতলা কাঠের বাড়ি। গোসলখানা আর রান্নাঘর আলাদা ছিল। পেছনে ফসলি জমি। বাড়ির পশ্চাদ্ভাগের উঠানে বেশকিছু ফল আর ফুলের বাগান করেছিলেন ফ্রাঙ্কলিন। বাড়ির চারপাশ নির্জন নিস্তব্ধ।

আশেপাশে আর কোনো বাড়ি নেই। অদূরে চারদিকে শুধু সুউচ্চ পাহাড় দাঁড়িয়ে ছিলো। ফসলি জমির মাঝখান দিয়ে চলে গেছে মেঠো পথ। আরও কিছু আছে হয়তো। কিন্তু এতো কিছু খেয়াল করেনি কেউ। বাড়িতে পৌঁছে প্রথমেই হাতে হাতে কাজ করেছে সবাই। নিজেদের জিনিসপত্র গোছায়। ফ্রাঙ্কলিনের স্ত্রী মাদাম ল্যারি সাদরে গ্রহন করেছিলেন ওদের। বেশ খুশি হয়েছিলেন তিনি। সবার জন্য একহাতে রাতের খাবার রান্না করেছিলেন।

গোসল শেষ করে সবাই একসাথে খাবার খেয়ে নিলো। তারপর বসে থেকে সিয়া, ইনায়া আর আর্নির সাথে বেশ কিছুক্ষন গল্প করলেন মাদাম ল্যারি। অনেকটা সময় পেরিয়ে গেলো। দেখতে দেখতে ঘড়ির কাটায় দশটা বেজে গেল। সবাই বেশ ক্লান্ত ছিল।ঘুমানের সিদ্ধান্ত নিলো। একটা কামরায় একসাথে শুয়ে পড়ল সিয়া, ইনায়া আর আর্নি। বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই দু’চেখের পাতায় গভীর ঘুম নেমে এলো।

ধীরে ধীরে সময় গড়ালো। রাত গভীর হলো। কামরার মধ্যে হিসহিসানির শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেলো সিয়ার। আর্নি আর ইনায়া তখন গভীর ঘুমে নিমগ্ন। দরজা জানালাগুলো সব বন্ধ। বাইরে হিমশীতল বাতাস বইছিলো। হয়তো বাতাসের শব্দ ছিলো। সিয়া পুনরায় চোখের পাতা বুজে নিলো। কিন্তু ফের শুনতে পেল সেই হিসহিসানির শব্দ। শব্দটা খাটের নিচ থেকে ভেসে আসছিলো। গায়ের উপর থেকে মোটা কম্বল সরিয়ে ধীরপায়ে মেঝেতে নেমে দাঁড়ালো সিয়া। হঠাৎই কেমন নির্ভীক হয়ে উঠল। মেঝেতে বসে খাটের নিচে উঁকি দিতেই খানিকটা পিছিয়ে গেলো। ভীত ভীত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো বিশাল আকৃতির সবুজ অ্যানাকোন্ডাটার দিকে। সাপটা কেমন নড়চড় শুরু করলো। সিয়ার গাঁ শিউরে উঠলো। বাইরে থেকে দ্বিতীয়বারের মতো সেই নারী কন্ঠস্বর ভেসে এলো,

– ফ্লোরেনসিয়া। তোমাকে এখানে আসতেই হতো। কেনো ভয় পাচ্ছো? সামান্য একটা সাপকে দেখে ভয় পেলে শক্তিশালী ভ্যাম্পায়ারদের বিরুদ্ধে লড়বে কি করে?

কথা গুলো প্রতিধ্বনিত হয়ে সিয়ার কানে ঝংকার তুললো যেন। ও তো ঘুমিয়ে নেই এখন। তাহলে কি জেগে জেগে দুঃস্বপ্ন দেখছে? সিয়াকে নিশ্চুপ থাকতে দেখে তৃতীয়বারের মতো মেয়েটি আবারো কথা বললো,

– দরজা খুলে চলে এসো আমার কাছে।

– কে তুমি? কে? কেনো আমাকে বিরক্ত করছো?___সিয়া চিৎকার দিয়ে উঠে বললো।

দরজার বাইরে মেয়েটার খিলখিল হাসির শব্দ শোনা গেলো। খাটের নিচে দৃষ্টি পড়তেই সিয়া দেখতে পেলো অ্যানাকোন্ডাটা নেই।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।