বারান্দার মেঝেতে সোফার পেছনে পড়ে ছিলো ইলহামা অ্যালিয়েভের প্রাণহীন দেহপিঞ্জর। চোখ দু’টো খোলা। যেন একদৃষ্টে কিছু একটা দেখছিলেন। ঠোঁট দু’টো শুষ্ক, কালচে বর্ণ। সম্পূর্ণ মুখখানায় প্রিয়জনদের শেষবারের মতো দেখতে চাওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা।

ইনায়ার কন্ঠস্বর যেন অবরুদ্ধ হয়ে এলো। রক্তশূন্য মুখে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে অপলক তাকিয়ে রইল। সিয়ার ‘মা’ ডাক শুনতে পেয়ে ক্রিসক্রিংগল উরসুলাকে রেখে দৌড়ে এসে সিয়ার পাশে দাঁড়ালেন। মুহূর্তেই যেন তার সমগ্র দুনিয়া দুলে উঠল। বুকের ভেতরে প্রগাঢ় শূন্যতা অনুভব করলেন।

সবটাই কেমন ভয়ংকর দুঃস্বপ্নের মতো লাগল। সিয়া চাইল, খুব করে চাইল চোখের সামনে দেখা কোনো কিছুই যেন সত্যি না হয়। নিজের অজান্তেই ওর নিষ্প্রাণ চোখজোড়া থেকে একফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। ভয়াবহ গলা শুকিয়ে গেল। মুখ দিয়ে কোনো আওয়াজ করতে পারল না। দু’চোখের দৃষ্টি হয়ে এলো ঝাপসা। বক্ষস্থলে থাকা হৃদপিণ্ড’টা হাহাকার করে উঠল। দুর্দম্য অসহনীয় যন্ত্রণায় কাতরাতে শুরু করল। ক্রমশ ওর পা দু’টো কাঁপছে। ও এগিয়ে যাওয়ার সাহস পেল না ইলহামা অ্যালিয়েভের কাছে।

ইনায়া একপা দু’পা করে এগুলো। দপ করে মেঝেতে বসে পড়ল। ইলহামা অ্যালিয়েভের নাকের কাছে দু’আঙ্গুল রেখে পরীক্ষা করল। নিমেষেই কিছুটা পিছনে সরে গেল। ওর সর্বাঙ্গ ভয়ংকর ভাবে কাঁপতে শুরু করল। কয়েক পল সময় গড়াল। ইনায়া বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে দেখল। সহসা উন্মাদের ন্যায় ইলহামার বুকের উপর মাথা রাখল। গগনবিদারী চিৎকার দিয়ে উঠে বলল,

– মা। আপনি নিঃশ্বাস নিচ্ছেন না কেনো? আমি কেনো আপনার হৃৎস্পন্দনের শব্দ শুনতে পাচ্ছি না?

ইনায়া কাঁদল। উন্মাদের মতো কাঁদল। ক্রিসক্রিংগল শরীর ছেড়ে দিয়ে মেঝেতে পড়ে যেতে নিলেন। সিয়া তাকে দু’হাতে আঁকড়ে ধরল। আগলে নিলো। ওর সম্পূর্ন জগৎ সংসারটাই যেন শূন্য মনে হলো। শ্বাসপ্রশ্বাস রুদ্ধ হয়ে এলো। ক্রিসক্রিংগলকে ছেড়ে দিয়ে অসাড় হয়ে আসা পায়ে ইলহামার দিকে এগিয়ে গেল। নিঃশব্দে, আলগোছে পাশে বসল। দু’হাতে নিজের মাকে জড়িয়ে ধরল। হৃদয় নিংড়ানো আদুরে স্বরে ডাকল,

– মা!

ইলহামা সাড়া দিলেন না। সিয়া তার দু’গালে দু’হাত রাখল। কোমল স্পর্শে ইলহামার মুখখানা ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখল। আকুতিভরা করুণ স্বরে বলল,

– আমার দিকে তাকান না। আমি বাড়ি ফিরে আসতে অনেকটা দেরি করে ফেলেছি তাইনা? আমাকে ক্ষমা করুন।

সিয়ার কন্ঠস্বর অনবরত কাঁপছিল। ও কাঁপা কাঁপা কন্ঠে পুনরায় কথা বলল,

– আমার তো যাওয়াই উচিত হয়নি। আজকের পর থেকে আমি আপনাকে ছেড়ে কখনো কোথাও যাবো না। বিশ্বাস করুন।

ইনায়া ক্রমাগত চিৎকার করে কাঁদল। ওতো জানে ওর মা আর কখনো কথা বলবেন না। সিয়া বারকয়েক ডাকল। অসহায় কন্ঠে বলল,

– মা, দেখুন না আমার দিকে। দেখুন একবার।

ইলহামা দু’চোখের পলক ফেললেন না। সিয়ার দিকে তাকালেন না। নিথর দেহে পরম নিশ্চিন্তে শুয়ে রইলেন। সিয়া উদ্ভ্রান্তের মতো কিছু একটা খুঁজল। বারান্দার নিচে ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়ে পাওয়া পুরষ্কারটা পড়ে থাকতে দেখল। যখন অন্ধকারে উরসুলার দেহের সাথে পা বেঁধে হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়েছিলো, তখন হাত থেকে ওটা ছিঁটকে পড়েছিলো দূরে।

সিয়া ত্বরিত উঠে দাঁড়াল। এলোমেলো পায়ে বারান্দার নিচে নেমে গেলো। তলোয়ারটা হাতে তুলে নিলো। পুনরায় ইলহামার কাছে গিয়ে বসল। ওর দু’চোখ থেকে অবাধে অশ্রকনা গড়িয়ে পড়ল। ক্রমে ক্রমে আরও ঝাপসা হয়ে এলো ওর দু’চোখের দৃষ্টি। সিয়া ডাকল নিজের মাকে। ব্যথাতুর করুণ কন্ঠে অভিমানের সুর তুলে বলল,

– আমি এই সোনার তলোয়ার চাইনি মা। আমি তো আপনার ঠোঁটে এক চিলতে প্রাণোচ্ছল হাসি দেখতে চেয়েছিলাম। এইযে দেখুন, আমি আপনার কথা রেখেছি। বিজয়ী হয়ে ফিরেছি। আপনি হাসুন। হাসুন না একবার।

সিয়া থামল। ওর কথা বলতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল। দু’হাতে দু’চোখের অশ্রু মুছে ফেলল। ইলহামার শরীর ঝাঁকাল। তার দু’গালে আলতো হাতে চাপড় দিয়ে ডাকল। কাকুতিপূর্ন আর্ত কন্ঠে বলল,

– মা। মা তাকান না আমার দিকে। কথা বলুন। আমার ডাকে সাড়া দিন। আপনি এভাবে আমাদের ছেড়ে চলে যেতে পারেন না। এতোটা নিষ্ঠুর হতে পারেন না। আমি আপনাকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না। মা, আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে মা। একবার বুকে আগলে নিয়ে আদর করবেন না? আদুরে স্পর্শে আমার কপালে চুমু খাবেন না?

চোখের সামনে প্রিয়জনদের চার চারটে মৃতলা’শ পড়ে ছিলো। ক্রিসক্রিংগলের সমস্ত অনুভূতিগুলো যেন ভোঁতা হয়ে গেলো। একই সাথে স্ত্রী আর মায়ের মৃ’ত্যু। বন্ধু আর তার স্ত্রীর মৃ’ত্যু। নিজের মেয়ে দু’টো মাতৃহারা হলো। মাতৃহারা হয়ে গেলেন তিনি নিজেও। প্রাণপ্রিয় সহধর্মিণী স্বার্থপরের মতো তাকে একলা করে দিয়ে পৃথিবী থেকে চিরতরে বিদায় নিয়ে নিলেন। আর্নি আর ক্রিস্তিয়ান অনাথ হয়ে গেলো। ওদের দেখাশোনা করার মতো আর কেউ রইলো না। অনেকক্ষণ ধরে একনাগাড়ে কেঁদেই চলেছে ইনায়া। সিয়া অবুঝের মতো ইলহামাকে কতশত অভিযোগ করছিল। অনবরত অসহায় ব্যথাতুর কন্ঠে ডেকে বললো,

– মা, আপনি কি শুনতে পাচ্ছেন না? আমার বুকের মাঝখানে হওয়া যন্ত্রণাগুলো বুঝতে পারছেন মা? সাড়া দিচ্ছেন না কেনো? মা, আপনি উঠুন। আমার সাথে কথা বলুন।

বেশ কিছুক্ষণ সময় গড়িয়ে গেল। ক্রিসক্রিংগল দূর্বল হাতে ইলহামার গাল স্পর্শ করলেন। তার দু’চোখের কার্নিশ বেয়ে অঝোর ধারায় নোনাজল গড়িয়ে পড়ল। একহাতের আলতো ছোঁয়ায় ইলহামার খুলে রাখা চোখজোড়ার পাতা বুজিয়ে দিলেন। সিয়া চিৎকার দিয়ে উঠল। ভীত-সন্ত্রস্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,

– আপনি এটা কি করলেন?

ক্রিসক্রিংগল কোনো কথা বললেন না। দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে নেত্রচ্ছদ বুজে নিলেন। বুকের ভিতরে অথৈয়, অসীম শূন্যতা অনুভব করলেন। ক্রমে ক্রমে বুক ভারি হয়ে এলো তার। এই বুঝি নিঃশ্বাস আঁটকে যায়।

– মা, মা চোখ খুলুন।

অনবরত সিয়ার আর্তচিৎকার শোনা যায়। সাথে শোনা যায় ইনায়ার গগনবিদারী কান্নার সুর। ক্রিসক্রিংগল ব্যথা বেদনায় কিংকর্তব্যবিমুঢ়। নির্বাক, নিশ্চল শরীরে ঠায় বসে রইলেন।

আহত অবস্থায় আর্নি বিছানায় শুয়ে ছিল। ক্রিস্তিয়ান ওর হাত আর পায়ের ক্ষত জায়গাগুলো পরিষ্কার করে ঔষধ লাগিয়ে দিলো। আর্নি ঈষৎ কেঁপে কেঁপে উঠল। ওর হাত পায়ের ক্ষতস্থানগুলো ভীষন জ্বলছিল। বেশ ব্যথা করছিল। আর্নি ব্যথা সহ্য করতে না পারার কষ্টে ক্রিস্তিয়ানকে জিজ্ঞেস করল,

– মা আর বাবা কখন আসবে?

– শীঘ্রই চলে আসবে। রাস্তায় আছে হয়তো।___ম্লান কন্ঠে উত্তর দিল ক্রিস্তিয়ান।

– মা থাকলে আমার এতোটা কষ্ট হতো না। তুমি কিছু পারো না। ক্ষতস্থানগুলোতে ঔষধ লাগানোর নাম করে আরও বেশি ব্যথা দিচ্ছো।

– মুখ বন্ধ রাখ। একটাও শব্দ করবি না। তোকে কে বলেছিলো ঘোড়ায় চেপে বসে ছুটন্ত ঘোড়ার লাগাম ছেড়ে দিতে? নিজেকে দক্ষ ঘোড়সওয়ার মনে করিস নাকি?

– সিয়া পারলে আমি কেনো পারবো না?___আর্নির অকপট প্রশ্ন।

– ও তোর মতো বুদ্ধু নয়। ঠিক সময়ে প্রতিবার একহাতে লাগাম টেনে ধরেছিলো।

– আমিতো শুধু চেষ্টা করেছি।___আর্নি ঠোঁট উল্টে কাঁদো কাঁদো স্বরে বলল।

– হ্যাঁ, চেষ্টা করলি। অতঃপর ঘোড়া থেকে উল্টে পড়লি। তোর ভাগ্য ভালো ছিলো শুধু আঘাত পেয়েছিস। হাত পা ভেঙ্গে যায়নি।

একদিকে ক্রিসক্রিংগল তাগাদা দিলেও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান শুরু হতে বেশ খানিকটা দেরি হয়ে গিয়েছিল। অন্যদিকে সিয়া অস্থির হয়ে উঠেছিল বাড়িতে ফিরে যাওয়ার জন্য। তন্মধ্যে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের সময় অন্যান্য প্রতিযোগীরা উপস্থিত থাকলেও আর্নি আর ক্রিস্তিয়ানকে কোথাও দেখা যাচ্ছিল না। পুরস্কার বিতরণ শেষ হয়ে যায়। সিয়াকে গোল্ডেন সোর্ড উপহার দেওয়া হয়। সোর্ডটা ছিলো বিখ্যাত জাদুকর ফিদেল আলেকজান্দ্রো কাস্ত্রোরুজের।

ক্রিসক্রিংগল স্বয়ং উপহারটা সিয়ার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। ম্যাথস তৃণভূমিতে উপস্থিত থাকা মানুষগুলো বিস্মিত নয়নে পলকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলো। পুরনো হলেও তলোয়ারটা বেশ সুন্দর দেখতে। যেন এখনো সেটা রাজকীয় ঐতিহ্য বহন করছে। তলোয়ারের ধারালো অংশটুকু ছিল মূলত লোহার। কিন্তু এর হাতল আর উপরের অংশটুকু সম্পূর্ণ সোনার।

ক্রমে ক্রমে সময় গড়িয়ে যায়। ক্রিসক্রিংগল অস্থির হয়ে উঠেন। আর্নি আর ক্রিস্তিয়ান তৃণভূমিতে ফিরে না আসায় তার দুশ্চিন্তা হয়। সিয়া আর ইনায়াকে বাড়িতে ফিরে যেতে বলে তিনি ঘোড়া নিয়ে রওনা হন হ্যানস পাহাড়ের দিকে।

– ওরা বাবার সাথে বাড়িতে ফিরে যাবে। তুমি চলো আমার সাথে।

ইনায়াকে উদ্দেশ্য করে কথাটা বলছিল সিয়া। ইনায়া দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বিষণ্ণ বদনে বলে,

– ওদের ফেলে রেখে চলে যাওয়া কি ঠিক হবে? তাছাড়া আঙ্কেল কুরী আর হানি আমাদের বাড়িতেই আছে। মা আর দাদিন একা থাকবে বিধায় তাদেরকে সঙ্গ দিচ্ছে। তুমি এতো দুশ্চিন্তা করো না।

সিয়া দ্বিধাদ্বন্দে ভুগে। আরও খানিকটা সময় গড়িয়ে যায়। সন্ধ্যা সন্নিকটে। সহসা ঘোড়া ছুটিয়ে ক্রিস্তিয়ান ফিরে আসে। মুখখানা কেমন মলিন দেখায়। ক্রিস্তিয়ানের ঘোড়ায় তার সামনে আর্নি বসে আছে। পেছনে ক্রিসক্রিংগলের ঘোড়া।

– আর্নির কি হয়েছে?____শঙ্কিত গলায় জিজ্ঞেস করে ইনায়া।

– লাগাম ছেড়ে দিয়ে সিয়ার মতো ঘোড়া ছুটানোর শখ হয়েছিলো ওর। ঘোড়াটা দ্রুত বেগে ছুটছিলো। ভারসাম্য বজায় রাখতে না পারায় ঘোড়ার পিঠ থেকে উল্টে পড়ে গিয়েছিল। হাত পায়ে আঘাত পেয়েছে। আর ওর ঘোড়াটা কোন দিকে ছুটে গেছে কে জানে।

আর্নির অসহায় মুখখানা দেখে সিয়ার মায়া হয়। ইনায়া আর্নির উদ্দেশ্যে দুঃখ ভারাক্রান্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,

– গুরুতর আঘাত পাওনি তো?

আর্নি দু’দিকে মাথা নাড়িয়ে না বোঝায়। সিয়া ব্যতিব্যস্ত কন্ঠস্বরে বলে,

– তাহলে ফেরা যাক?

– হুম, চলো।_____ক্রিসক্রিংগল উত্তর দেন।

অতঃপর সবাই মিলে বাড়ির দিকে রওনা দিয়েছিল। আর্নিদের বাড়ির কাছে পৌঁছাতেই ক্রিস্তিয়ান বলেছিল,

– মাস্টার। আর্নি আহত। তাই আপনাদের বাড়িতে যেতে চাইছি না। অনুগ্রহ করে মা-বাবাকে তাড়াতাড়ি পাঠিয়ে দিবেন।

ক্রিসক্রিংগল সম্মতি জানান। ইনায়া আর সিয়াকে নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে ঘোড়া ছুটান। ততক্ষণে সন্ধ্যা হয়ে যায়। তখন থেকে এখন পর্যন্ত বেশ অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে। কিন্তু স্ট্রিকল্যান্ড কুরী আর সাসোলি কুরী বাড়িতে ফিরে আসেনি এখনো। ক্রিস্তিয়ানের মুখাবয়বে সুক্ষ্ম দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ল।

– এখনো মা-বাবা আসছে না কেনো?___প্রায় কাঁদো কাঁদো স্বরে আর্নি জিজ্ঞেস করল।

– আমি কি করে জানবো বলতো? তোকে একা রেখে সিয়াদের বাড়িতে যেতেও পারছি না। তুই চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাক, আরাম লাগবে। দুশ্চিন্তা করিস না। মা-বাবা চলে আসবে।

অগ্যতা আর্নি দু’চোখ বুজে শুয়ে রইল। একসময় ঘুমিয়ে গেল ও। ক্রিস্তিয়ানের দুশ্চিন্তা বাড়ল। কিন্তু আর্নিকে একা রেখে তার মা-বাবার খোঁজে বাড়ির বাইরে যেতে পারল না। সিঙ্গেল সোফায় গা এলিয়ে দিল। সে ভীষণ ক্লান্ত ছিল। দু’চোখের পাতা বুজে নিতেই গভীর নিদ্রায় তলিয়ে গেল।

লন্ঠনের আলোয় দৃষ্টিগোচর হলো বাড়ির আসবাব আর জিনিসপত্র সব লন্ডভন্ড। ওরা যেন কোনো কিছুর তল্লাশি চালিয়েছিল।

– আমিতো ভুলেই গিয়েছিলাম ঐ জিনিসগুলোর কথা। আমার বোঝা উচিত ছিলো ওগুলো খুঁজতে পি’শাচরা পুনরায় আমার বাড়িতে আসতে পারে।____বিরবির করে কথাগুলো বলে উঠলেন ক্রিসক্রিংগল।

চমকে তাকাল সিয়া। এই মুহূর্তে ওর বাবা কোন জিনিসগুলোর কথা বললো? বিরবির করে বললেও কথাগুলো স্পষ্ট শুনতে পেয়েছে ও। কাঁদতে কাঁদতে ইনায়ার মূর্ছা যাওয়ার মতো অবস্থা। কোনোদিকে খেয়াল নেই ওর। আচম্বিতে সিয়ার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সজাগ হয়ে উঠল। ও উৎকর্ণ হয়ে স্থির বসে রইল। শক্তহাতে তলোয়ার চেপে ধরল। হঠাৎ করেই ওর কান্না থেমে গেল। সিয়ার মনে হলো অচিরেই ওদের দিকে আবারও কোনো ভয়ংকর দূর্যোগ ধেয়ে আসছিল।

ওর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় ওকে সতর্ক করতে না করতেই ডান দিক থেকে একটা আক্রমণ ঘনিয়ে এলো। সিয়া সশব্দে তলোয়ারের খাপ খুলে ফেলল। ক্রিসক্রিংগল ভীত-সন্ত্রস্ত দৃষ্টিতে তাকালেন। ইনায়া ভয়াবহ চমকাল। বাতাসের গতিতে কিছু একটা সিয়ার দিকে এগিয়ে গেল। সিয়া লক্ষ্য স্থির রাখল। মুহূর্তেই দুর্বোধ্য হয়ে উঠল। উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল। শরীরের সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে শূন্যে আঘাত করল। ওর কন্ঠনালি থেকে উচ্চারিত হলো,

– ইয়াহহহহ।

সাথে সাথে একটা বীভৎস চিৎকার শোনা গেল। বারান্দা থেকে কিছুটা দূরে ছিঁটকে পড়ল কেউ। একহাতে গলার একপাশটা শক্ত করে চেপে ধরে আছে সে। সিয়ার চোখ দু’টো রক্তবর্ণ হয়ে গেছে। সহসা দমকা বাতাসে ওর চুলগুলো উড়তে শুরু করে। ওকে ভীষণ ভয়ংকর লাগছিল দেখতে। যেন মুখখানা অসামান্য ক্রোধের অনলে জ্বলছে। গোলাপী রঙা ঠোঁটগুলো অনবরত কাঁপছে।

একহাতে গলা চেপে ধরে শূন্যে ভাসতে শুরু করল শ্যারন। ঝকঝকে ধারালো তলোয়ারের আঘাতে তার গলা থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। চোখে মুখে ভয়াল, কুটিল হিংস্রতার ছাপ প্রকাশ পাচ্ছে। চোখের সামনে সেদিনকার সেই পি’শাচটাকে দেখে ক্রিসক্রিংগল আর ইনায়া বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। সিয়া আরো শক্তহাতে তলোয়ার চেপে ধরে। ক্রোধিত কন্ঠে উচ্চস্বরে জিজ্ঞেস করে,

– আমার মা-দাদিন আর বাকি দু’জনের হ’ত্যাকারী তুই?

শ্যারন শব্দ করে হাসে। হাসতে হাসতে যেন গড়িয়ে পড়ে যাবে সে। সিয়ার ক্রোধ বাড়ে। পারে নাতো উড়ে গিয়ে শ্যারনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। আচমকা শ্যারনের হাসি মিলিয়ে যায়। আক্রোশপ্রসূত কন্ঠস্বরে সে বলে,

– এখানে পৌঁছাতে অনেকটা দেরি করে ফেলেছি। আমি ব্যতীতই ওরা নয়জন ছিলো। ইতোমধ্যে যারা নিজেদের নৃশংসতা সম্পন্ন করে গেছে। কিন্তু আমি ভাবছি অন্য কথা।

এতটুকু বলে শ্যারন নিজের গালে হাত রাখে। কৌতুহলী হয়ে ভ্রু কুঁচকে ফেলে। বিস্মিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,

– এতোগুলো ভ্যাম্পায়ার এখানে আসার পরও তোরা তিনজন বেঁচে গেলি কি করে?

অসামান্য রাগে ইনায়ার শরীর কাঁপতে শুরু করে। ক্রিসক্রিংগলের মস্তিষ্কে দপ করে আগুন জ্বলে উঠে। ক্রমে ক্রমে সিয়ার ক্রোধ বাড়ে। ওর শিরায় শিরায় খু’নের উন্মাদনা জেগে উঠে। ও ক্রুদ্ধ কন্ঠে গর্জে ছেড়ে বলে,

– সাহস থাকলে আমার সামনে এসে দাঁড়া শ’য়তান। চেষ্টা করে দেখ প্রাণ নিয়ে ফিরে যেতে পারিস কিনা।

শ্যারন পুনরায় হাসে। যেন সিয়াকে রাগিয়ে দিয়ে সে ভীষণ প্রশান্তি অনুভব করে। অথচ সিয়ার কাছে যাওয়ার সাহস পায়না। মনে মনে ভাবে,

– মেয়েটা ভীষণ বিপজ্জনক। আমার একার পক্ষে ওকে মে’রে ফেলা সম্ভব হবে না। আমি পুনরায় প্রাণের ঝুঁকি নিতে চাইনা।

সিয়া প্রস্তুতি নেয়। ওর মাথায় অন্যকিছু চলছে। হাতের তলোয়ারটা আরও শক্ত করে ধরে। কয়েক সেকেন্ডের জন্য শ্যারন অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে। সিয়া সুযোগটা কাজে লাগায়। শ্যারনের গলা বরাবর তলোয়ার নিক্ষেপ করে। ধারালো অংশটা শ্যারনের গলায় গিয়ে লাগে। তলোয়ারটা মাটিতে পড়ে যায়। শ্যারন প্রচন্ড রাগান্বিত হয়। তার বোধশক্তি যেন লোপ পায়। আক্রমনাত্মক হয়ে সিয়ার দিকে ছুটে যায়। কাছাকাছি পৌঁছাতেই ক্রিসক্রিংগলের পেশিবহুল মুষ্টিবদ্ধ একহাতের শক্তপোক্ত আঘাতে মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে।

অনেকক্ষণ যাবৎ খুব কষ্টে শ’য়তান’টাকে সহ্য করছিলেন ক্রিসক্রিংগল। অপেক্ষায় ছিলেন একটা সুযোগের। কখন জা’নোয়ারটা কাছে আসবে। অবশেষে সুযোগ পেলেন। তার আঘাতটা ঘুষিতেই সীমাবদ্ধ রইল না। বীরদর্পে শ্যারনের কাছে ছুটে গেলেন। ইনায়াও দৌড়ে গেলো শয়তানটার দিকে। ক্রিসক্রিংগল শ্যারনকে বিন্দুমাত্র সুযোগ দিলেন না। মাটি থেকে তুলে নিয়ে দু’হাতে গলা চেপে ধরলেন।

শ্যারন শব্দ করে হাসতে শুরু করে। যেন ভীষন মজা পাচ্ছে সে। ক্রিসক্রিংগলকে এক ধাক্কায় ফেলে দেয় কিছুটা দূরে। সাথে সাথে তাকে ইনায়া আঘাত করে। পিঠ পেছন থেকে সজোরে লাথি মারে। শ্যারনের ক্রোধ বাড়ে। সে একহাতে ইনায়ার গলা চেপে ধরে। তন্মধ্যে সিয়া একটা অপ্রত্যাশিত আক্রমণ করে বসে। তলোয়ার চালিয়ে দেয় শ্যারনের পিঠে। শ্যারন কাতর আর্তনাদ করে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছন ফিরে দেখে।

সিয়া তার পিঠ থেকে তলোয়ার বের করে আনে। ইয়ানা সামনে থেকে শ্যারনের বুকে লাথি মারে। ওর গলা ছেড়ে দিয়ে শ্যারন মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। সিয়া দেহের সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে মাটিতে পড়ে থাকা শ্যারনের বুকে পা চেপে ধরে। ইনায়া জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। যেন চোখ দিয়েই ঝলসে ফেলতে চায় শ’য়তানটাকে। সিয়া রাগান্বিত কন্ঠস্বরে জিজ্ঞেস করে,

– নাম বল ওই নয়জন পি’শাচের।

শ্যারন পুনরায় শব্দ করে হাসে। সিয়া দু’হাতে তলোয়ারটা খানিকটা উপরে তুলে তার বুকে গেঁথে দেয়। অতঃপর মোচড়াতে শুরু করে। শ্যারন অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফটিয়ে উঠে। ক্ষীণস্বরে বলে,

– বলছি, বলছি।

ইনায়া শ্যারনের দু’হাত আর ক্রিসক্রিংগল দু’পা চেপে ধরে। পালিয়ে যাওয়ার সব রাস্তা বন্ধ। শ্যারন করুণ কন্ঠে কাতর আর্তনাদ করতে থাকে। কাতরাতে কাতরাতে বলে,

– অনারেবল এমপ্রেস পিদর্কা স্যাভেরিন, তার ভাই উড্রো উইলসন, মেয়ে ভিক্টোরিয়া এবং ক্যারলোয়েন, জামাতা জ্যাসন মিকারলি, উইলসনের মেয়ে অ্যালিস, উইলসনের পুত্র ব্রাংকো, বিশ্বস্ত সেবক স্যান্ড্রি। আরেকজনের নাম জানিনা আমি।

– এদের সবাইকে পরিচালনা করেছে কে? আমি তার নাম জানতে চাই। কে আছে সবকিছুর মূলে?

– ভ্যাম্পায়ারদের ওভারলর্ড ক্লীভল্যান্ড এদুয়ার্দো স্যাভেরিন। এখানে যা কিছু হয়েছে সবটাই তার নির্দেশে। আমি সব সত্যি বলে দিয়েছি। এবার আমাকে ছেড়ে দাও। আমি কাউকে হ’ত্যা করিনি।

এদুয়ার্দোর নাম শুনে সিয়া দুর্দমনীয় ভয়ংকর হয়ে উঠে। ওর চোখজোড়া থেকে যেন ক্রোধের ফুলিঙ্গ ঝড়ে পড়ে। শ্যারনের বুক থেকে তলোয়ার তুলে সজোরে গলায় গেঁথে দেয়। আকাশ কাঁপিয়ে চিৎকার দিয়ে উঠে শ্যারন। ফিনকি দিয়ে কয়েক ফোঁটা রক্ত এসে সিয়ার চোখেমুখে লাগে। সিয়া তলোয়ার তুলে পুনরায় আঘাত করে। এবার নিমিষেই শ্যারনের ধর থেকে মাথাটা আলাদা করে ফেলে। কয়েক সেকেন্ড ছটফট করে শ্যারনের দ্বিখণ্ডিত দেহ। অতঃপর পুরোপুরি নিস্তেজ হয়ে যায়।

– বাবা, এই র’ক্তচোষা পি’শাচের মাথাসহ দেহটা আগুনে জ্বালিয়ে দিন।____সিয়া ক্রোধিত কন্ঠে বলে।

হঠাৎই কারো গোঙ্গানির শব্দ শোনা যায়। তিনজন মানুষ কান পেতে শোনে। সতর্ক দৃষ্টিতে চারপাশে নজর বুলায়। শব্দটা সিঁড়ির অভিমুখ থেকে আসছে। ক্রিসক্রিংগল ধীরপায়ে এগিয়ে যান। পেছনে সিয়া আর ইনায়া। সিঁড়ির কাছাকাছি আসতেই চমকে যায় তিনজনে। স্ট্রিকল্যান্ড গোঙ্গাচ্ছেন। তাহলে কি তিনি বেঁচে আছেন? সিয়া আর ইনায়া একে অপরের মুখের দিকে তাকায়। ক্রিসক্রিংগল দৌড়ে যান। স্ট্রিকল্যান্ডের মাথাটা তুলে নিজের দু’হাটুর উপরে রাখেন। দু’গালে চাপড় দিয়ে ডাকেন,

– স্ট্রিকল্যান্ড! স্ট্রিকল্যান্ড কথা বলো।

স্ট্রিকল্যান্ড আধবোজা চোখে তাকালেন। সিয়া বেপরোয়া হয়ে উঠে। দু’হাটু মুড়ে বসে পড়ে স্ট্রিকল্যান্ডের পাশে। কাতর গলায় জিজ্ঞেস করে,

– কে মে’রেছে আমার মাকে?

– একটা ছাই রঙা ট্রেঞ্চকোট পরিহিত ছেলে। আমার চোখের সামনে ইলহামার শরীরের সমস্ত রক্ত শুষে খেয়ে মে’রে ফেলেছে তাকে। একটা মহিলা ওর নাম ধরে ডেকেছিলো।___স্ট্রিকল্যান্ড ক্ষীণস্বরে বলেন।

– কি নাম ছিলো ওর?____ক্রুদ্ধ কন্ঠে জিজ্ঞেস করে ইনায়া।

– আব্রাহাম স্যাভেরিন।

– আব্রাহাম স্যাভেরিন?

নামটা কোথাও শুনেছিলো ইনায়া। ও মনে করার চেষ্টা করে। মনে পড়তেই অসামান্য ক্রোধে নেত্রচ্ছদ বুজে ফেলে।

_______★★_______

কিয়েভ, স্যাভেরিন ক্যাসল।

অন্ধকার রাত। আকাশে ঘন-কালো মেঘ। স্যাভেরিন ক্যাসলের বাইরে প্রবাহমান শিরশিরে বাতাস। ক্যাসলের কোনো এক টাওয়ারের ছাদে দাঁড়িয়ে ছিলো এদুয়ার্দো। মুখাবয়বে ফুটে আছে রাজ্যের গাম্ভীর্য। পরনে কালো শার্ট আর সাদা প্যান্ট। শার্টের রোল আপ করে রাখা হাতা দু’টো কনুই থেকে আরও একটু উপরে তুলে নিলো। অতঃপর প্যান্টের দুই পকেটে হাত ঢুকিয়ে বুক টানটান করে দাঁড়াল। বেশকিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। নিষ্পলক চোখে অদূরে থাকা পাহাড়গুলো দেখছিল। আশপাশটা যেন শূন্য খাঁখাঁ করছিল। হঠাৎ কাঁধের উপর কারো হাতের স্পর্শ অনুভব করল। পেছন ফিরে তাকাল না। আদুরে স্বরে ডাকল,

– মা!

পিদর্কা স্যাভেরিন ঠোঁট ছড়িয়ে হাসলেন। চোখের পলকে এদুয়ার্দোর সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। এদুয়ার্দো স্থির নয়নে দেখল,

– কখন এলে?_____উচ্ছ্বসিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন পিদর্কা স্যাভেরিন।

– অনেকক্ষণ হবে। এখানে এসে আপনাদের কাউকে দেখতে পাইনি। কোথায় গিয়েছিলেন?___শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করল এদুয়ার্দো।

– এইতো শিকারে।

– সবাই মিলে একসাথে?___এদুয়ার্দোর বিস্মিত কন্ঠ।

– হুম। তুমি উপস্থিত থাকলে, তোমাকেও সাথে নিয়ে যেতাম।___হাস্যোজ্জ্বল মুখে বললেন পিদর্কা স্যাভেরিন।

এদুয়ার্দো কোনো কথা বলল না। পিদর্কা স্যাভেরিন অকপটে জিজ্ঞেস করেন,

– হঠাৎ কেনো এসেছিলে?

– আপনাকে দেখতে। আর কিছু প্রশ্নের উত্তর জেনে নিতে।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।